সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি তাঁদের সন্তান বা নাতি-নাতনিকে অথবা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জীবদ্দশায় নিজের ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। ইসলামি অঙ্গন ও আলেমদের পক্ষ থেকে এই আইন নিয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে। তাঁদের আপত্তির সারকথা হচ্ছে, এটি ইসলামের উত্তরাধিকার ও ওসিয়ত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।
এই পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা স্পষ্ট করা জরুরি মনে করছি:
১. আমরা মনে করি, আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইসলামের উত্তরাধিকার বা ওসিয়তের যে আইন রয়েছে, তার সাথে নতুন এই আইনটি মোটেও সাংঘর্ষিক নয়। কেননা, মুসলিম উত্তরাধিকার ও উইল আইন আগের অবস্থায় বহাল রয়েছে। নতুন এই আইনের মাধ্যমে জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দান করতে রাষ্ট্র কাউকে বাধ্য করছে না। শুধু এতটুকু হচ্ছে যে, কেউ এমনটি করলে রাষ্ট্রের কাছে তা স্বীকৃত হবে।
২. জীবদ্দশায় ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করে দান করাকে আসলে পূর্ণাঙ্গ দান বলা যায় না। এটাতে ওসিয়ত বা উইলেরও একটি দিক আছে। আমাদের আলেমদের আপত্তি এখানেই। কারণ, তাঁদের মতে সম্পদের এক তৃতীয়াংশের বেশি উইল করার সুযোগ ইসলামে নেই। এছাড়া তাঁরা মনে করেন, কোনো অবস্থায়ই কোনো ওয়ারিশের জন্য উইল করার সুযোগও ইসলামে নেই।
এ বিষয়ে আলেমদের কাছে আমার বিনীত নিবেদন হচ্ছে, ওসিয়তের ক্ষেত্রে আপনারা এটাকেই ইসলামের বিধান মনে করলে মানুষের সামনে এটাকে তুলে ধরুন এবং এটাকেই অনুসরণ করতে বলুন। কিন্তু কেউ আপনাদের এই মতামত মানতে না চাইলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে বাধ্য করার সুযোগ নেই।
৩. কোনো অবস্থায়ই কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত করা যাবে না, এটি একটি ফিকহি মত। কিন্তু কুরআনের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সুরা নিসার ১২ নম্বর আয়াত থেকে যা বোঝা যায়, তা হলো আত্মীয়তার ভিত্তিতে কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত করা যাবে না। কেননা আত্মীয়তার ভিত্তিতে আল্লাহ নিজেই ওয়ারিশদের হিস্যা বণ্টন করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ এটাকে নিজের ওসিয়ত বলে ব্যক্ত করেছেন। অতএব, যে বিষয়ে আল্লাহর ওসিয়ত রয়েছে, সে বিষয়ে অন্য কারও ওসিয়তের সুযোগ নেই। তবে তার মানে এই নয় যে, কোনো ওয়ারিশের বিশেষ কোনো সমস্যা, প্রয়োজন বা অতিরিক্ত সেবার ভিত্তিতে তার জন্য ওসিয়ত করা যাবে না। যে হাদিসে বলা হয়েছে, ওয়ারিশের জন্য কোনো ওসিয়ত নেই, সেই হাদিসে আসলে নিছক আত্মীয়তার ভিত্তিতে ওসিয়তের কথা বলা হয়েছে।
৪. সম্পদের এক তৃতীয়াংশের বেশি উইল করার সুযোগ নেই, এটিও একটি ফিকহি মত। একজন সাহাবি তাঁর পুরো সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় ওসিয়ত করে দিতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে এক তৃতীয়াংশের বেশি ওসিয়ত না করার পরামর্শ দেন। এটার ওপর ভিত্তি করেই এই ফিকহি মত প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু একজনের ব্যক্তিগত অবস্থার ওপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি পরামর্শ তো আর শরিয়তের বিধান হয়ে যায় না এবং সবার ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে প্রযোজ্য হয় না। কুরআনে উত্তরাধিকারের আয়াতে বারবার বলা হয়েছে, উত্তরাধিকারের হিস্যাগুলো মৃত ব্যক্তির যেকোনো ওসিয়ত বা ঋণ পরিশোধের পর কার্যকর হবে।
৫. কোনো ব্যক্তির শুধু কন্যাসন্তান থাকলে অর্ধেক বা দুই তৃতীয়াংশ সম্পদ তাদেরকে দেওয়ার পর বাকি অর্ধেক বা এক তৃতীয়াংশ কারা পাবে, তা কুরআন নির্ধারণ করে দেয়নি।
এর কারণ হলো, ঐ সময়কার আরবের গোত্রীয় সমাজে যে ব্যক্তির শুধু কন্যাসন্তান থাকত, তার ভাই-ভাতিজা বা অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়-স্বজন তার নিরাপত্তা দিত। তাই এই অংশটুকু রাখা হয়েছে যাতে ঐ ব্যক্তি তার বিবেচনা অনুযায়ী এমন এক বা একাধিক ব্যক্তিকে এই অবশিষ্ট অংশটুকুর উত্তরাধিকারী বানাতে পারেন। অথবা তিনি উত্তরাধিকারী না বানালেও এটা এমন লোকদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
সেই পরিস্থিতি তো আমাদের সমাজে এখন আর নেই। তাই এখন এই অবশিষ্ট অংশটুকুও মেয়েদের জন্য উইল করা যাবে। বরং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কুরআনের বর্ণিত মূলনীতি অনুযায়ী এটাই এখন করতে হবে।
৬. মুসলিম পারিবারিক আইনে উইলের ক্ষেত্রে প্রচলিত ফিকহি মত অনুযায়ী ওয়ারিশদের জন্য উইল না করার এবং এক তৃতীয়াংশের বেশি উইল না করার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। আমরা মনে করি, সরাসরি এই উইল আইন সংশোধন করে শর্ত দুটি উঠিয়ে দিলে ভালো হত। এটা করলে জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানের আইন করার প্রয়োজন হত না। কেউ চাইলে ব্যক্তিগতভাবে এই দুইটি শর্ত মেনে উইল করতে পারতেন, আবার কেউ চাইলে উন্মুক্তভাবেও উইল করতে পারতেন।
৭. কুরআনের নির্দেশ হলো, ওসিয়তের ক্ষেত্রে মানুষের খেয়াল রাখা উচিত, যেন এর দ্বারা কাউকে ঠকানো না হয়। তাই ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হলো, ওসিয়ত বা উইলের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখা। যদি কেউ এ ক্ষেত্রে বেইনসাফি করে, তাহলে পরকালে সে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির সম্মুখীন হবে।
মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply