হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ঈমানদারদের মধ্যে গরিব লোকেরা ধনীদের ৫০০ বছর আগে জান্নাতে যাবে।” (তিরমিজি: ২৩৫৩)
এই হাদিসের মর্ম বুঝতে হলে এখানে আমাদের কয়েকটি বিষয় বুঝতে হবে:
১. হালাল ও বৈধ উপায়ে ধন-সম্পদ অর্জন করা ইসলামে নিন্দনীয় কোনো বিষয় নয়। কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এটিকে ‘আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধান’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। (দ্রষ্টব্য, সুরা জুমা: ১০, সুরা মুজ্জাম্মিল: ২০)
২. জান্নাতের যাওয়ার জন্য কুরআনে বর্ণিত মূল মানদণ্ড হলো, ঈমান ও সৎ কর্ম। ধনী বা গরিব হওয়া জান্নাতে যাওয়ার বা জান্নাতে আগে যাওয়ার কোনো মানদণ্ড নয়।
৩. এই পৃথিবীতে আল্লাহ আমাদের পরীক্ষায় ফেলেছেন। এই পরীক্ষা হলো ঈমান ও সৎ কর্মের পরীক্ষা। এই পরীক্ষার জন্যই আল্লাহ মানুষের মধ্যে তারতম্য রেখেছেন। কিছু লোককে তিনি বেছে নিয়েছেন কৃতজ্ঞতার পরীক্ষার জন্য, তাদেরকে তিনি অঢেল সম্পদ দিয়েছেন। আর কিছু লোককে তিনি বেছে নিয়েছেন ধৈর্যের পরীক্ষার জন্য, তাদেরকে তিনি সহায়-সম্পদ থেকে বঞ্চিত রেখেছেন।
এই দুই পরীক্ষার মধ্যে ধৈর্যের পরীক্ষা দুনিয়াতে জীবনযাপনের দিক থেকে কঠিন হলেও প্রকৃতপক্ষে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তুলনামূলক সহজ। কারণ দারিদ্র্যের কশাঘাত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষকে আল্লাহমুখী করে। পক্ষান্তরে কৃতজ্ঞতার পরীক্ষা এর তুলনায় অনেক কঠিন। কারণ ধন-সম্পদ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষকে আল্লাহবিমুখ করে এবং তাদের মধ্যে অহংকার ও আত্মম্ভরিতার জন্ম দেয়। তারা আল্লাহকে ভুলে যায় এবং সবকিছু নিজেদের অর্জন বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তারা মানুষকে অবজ্ঞা করে এবং তাদের সম্পদে সমাজের অসহায় মানুষদের অধিকার আছে বলে মনে করে না।
৪. অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধনীরা কৃতজ্ঞতার পরীক্ষায় বিফল হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সবাই একরকম। পৃথিবীতে সবসময়ই বহু ধনী লোক এমন ছিলেন এবং আছেন যারা আল্লাহর এই কৃতজ্ঞতার পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। তারা ধন-সম্পদ পেয়ে অহংকারের পরিবর্তে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হন। তারা মানুষকে অবজ্ঞার চোখে দেখেন না, বরং তারা তাদের সম্পদ অসহায় মানুষদের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দেন এবং এটিকে তারা দরিদ্র মানুষদের অধিকার মনে করেন। তবে এমন লোকদের সংখ্যা তুলনামূলক কম।
৫. হাদিসে যা বলা হয়েছে, তা অধিকাংশের ভিত্তিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ঈমানদারদের মধ্যে অধিকাংশ গরিব লোকেরা অধিকাংশ ধনীদের বহু আগে জান্নাতে চলে যাবে। তার কারণ এটাই যে, গরিবদের জন্য দুনিয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তুলনামূলক সহজ ছিল, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা উত্তীর্ণ হতে পেরেছে, যদিও দুনিয়ায় তাদের জীবনযাপন অনেক কঠিন ছিল। অন্যদিকে অধিকাংশ ধনীদের ক্ষেত্রে ঠিক তার বিপরীত হয়, তাই তারা হিসাবের জন্য আটকে যাবে। তবে ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছে। বহু ধনী লোক বিনা হিসাবে সবার আগে জান্নাতে চলে যাবে।
৭. অপর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “গরিব মুহাজিরগণ কিয়ামতের দিন ধনীদের ৪০ বছর আগে জান্নাতে যাবে।” (সহিহ মুসলিম: ৩৭) এখান থেকে বোঝা গেল, এই ব্যবধান ৪০ থেকে ৫০০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। বস্তুত এটা হবে ঈমান ও সৎ কর্মের ব্যবধানের অনুপাতে।
মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply