বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা প্রায়ই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের শাসনের নামে অমানবিক ও লোমহর্ষক দৃশ্যের ভিডিও দেখতে পাই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শাসনের নামে শিক্ষক শিশুকে পা উপরের দিকে এবং মাথা নিচের দিকে দিয়ে ঝুলিয়ে রাখছেন কিংবা ফ্লোরে ফেলে বেদম মারধর করছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুদের ওপর এমন আচরণ চরম অন্যায় এবং জুলুম। ইসলাম কখনোই শিক্ষার নামে এই ধরনের অমানবিক পদ্ধতি সমর্থন করে না।
ইসলামে শিশুদের বিশেষ মর্যাদা ও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তারা নিষ্পাপ এবং তাদের কোনো গুনাহ নেই। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেছেন:
“তিন প্রকার ব্যক্তির ওপর থেকে (গুনাহের) কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১. শিশু, যতক্ষণ না সে সাবালক হয়। ২. ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়। ৩. পাগল ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে সুস্থ হয়।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৪০৩)।
যেহেতু শিশুরা নিষ্পাপ, তাই তাদের ওপর কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। ছোটদের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ প্রদর্শনের ব্যাপারে ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (মুসনাদে আহমদ: ৬৭৩৩)।
শিশুদের গড়ে তোলার সঠিক পদ্ধতি হলো তাদের প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা ও মায়া-মমতা প্রদর্শন করা। মারধর বা নির্যাতন শিশুর মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং মেধার চরম ক্ষতিসাধন করে।
বিশেষ করে হিফজখানাগুলোতে শিশুদের যে পদ্ধতিতে ভর্তি করা হয়, তা আসলে সঠিক পদ্ধতি নয়। শিশুকে দুনিয়ার সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধুমাত্র কুরআন মুখস্থ করার ওপর প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়, যা শিশুর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। সাহাবায়ে কেরামের যুগে এমন পদ্ধতি ছিল না।
কুরআন মুখস্থ করা ও সংরক্ষণ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ এবং এটি জারি রাখা জরুরি, তবে এর পদ্ধতি হতে হবে সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত। শিশুর সামগ্রিক ও মানবিক বিকাশের জন্য বর্তমান যুগে তাকে সব বিষয়ে প্রয়োজনীয় সাধারণ শিক্ষা (General Education) প্রদান করা তার অন্যতম মৌলিক অধিকার। এই ব্যাপকভিত্তিক (Broad-based) শিক্ষার পাশাপাশি তাকে কুরআন পড়া শেখাতে হবে। কুরআন মুখস্থ করানোর প্রক্রিয়াটি হতে হবে ধাপে ধাপে, শিশুর আগ্রহ ও মেধার ওপর ভিত্তি করে। প্রথমে কুরআন পড়া শেখানো, এরপর ছোট ছোট সূরা মুখস্থ করানো এবং ধীরে ধীরে তার সামর্থ্য অনুযায়ী অগ্রসর হওয়া উচিত। জোরপূর্বক বা অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে শিক্ষাদান কোনোভাবেই কাম্য নয়।
পরিশেষে, শিশুদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মারধর ও নির্যাতনের পথ পরিহার করে ইসলামি আদর্শ অনুযায়ী ভালোবাসা ও মমতার পথ অনুসরণ করা উচিত।
মাওলানা উমর ফারুকের লেকচারের আলোকে
লেখক: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply