মানুষের চরিত্র যেমন, তার জীবনসঙ্গীও কি তেমন হওয়া বাধ্যতামূলক?

admin Avatar

পবিত্র কুরআনের সূরা নূরের ২৬ নম্বর আয়াতের ভিত্তিতে অনেকে মনে করেন, মানুষের চরিত্র যেমন, তার জীবনসঙ্গীও তেমন হবে। অর্থাৎ, একজন ভালো পু্ুরুষের স্ত্রী কখনোই খারাপ হতে পারে না। একইভাবে একজন ভালো নারীর স্বামী কখনোই খারাপ হতে পারে না।

কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় যে, এ আয়াতে আসলে এমন কোনো কথা বলা হয়নি৷ তাছাড়া এ কথা বাস্তবতারও বিপরীত। কুরআন নিজেই এমন কিছু বাস্তব উদাহরণ দিয়েছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের ছিলেন।  

ফেরাউন ছিল অবিশ্বাস, অহংকার ও অত্যাচারের মূর্তপ্রতীক। অথচ তার স্ত্রীকে কুরআন মুমিনদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তিনি ফেরাউনের পথ প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন—তাঁর জন্য যেন জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হয় এবং তাঁকে ফেরাউন ও তার কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। অন্যদিকে নূহ (আ.) ও লূত (আ.) ছিলেন আল্লাহর দুজন মহান নবী, কিন্তু তাঁদের স্ত্রীদেরকে কুরআন অবিশ্বাসীদের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

অতএব, দুনিয়ার জীবনে স্বামী বা স্ত্রী কোনো একজনের ঈমান, চরিত্র ও নৈতিক অবস্থান দিয়ে অপরজনকে মূল্যায়ন করা যে অন্যায়, তা কুরআনের এসব উদাহরণের মাধ্যমেই স্পষ্ট। একজন মুমিনের জীবনসঙ্গী অবিশ্বাসী হতে পারে, আবার একজন অবিশ্বাসী ব্যক্তির জীবনসঙ্গী হতে পারেন মুমিন। কাজেই সূরা নূরের ২৬ নম্বর আয়াতকে দুনিয়ার দাম্পত্যজীবনের সাথে সম্পর্কিত করার আগে আয়াতটির পূর্বাপর প্রসঙ্গ দেখা জরুরি।

আয়াতটির মূল বক্তব্য হলো:

اَلْخَبِيْثٰتُ لِلْخَبِيْثِيْنَ وَالْخَبِيْثُوْنَ لِلْخَبِيْثٰتِ ۚ وَالطَّيِّبٰتُ لِلطَّيِّبِيْنَ وَالطَّيِّبُوْنَ لِلطَّيِّبٰتِ ۚ أُولَٰئِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُوْلُونَ ۚ لَهُمْ مَّغْفِرَةٌ وَّرِزْقٌ كَرِيمٌ

অর্থ: “সেদিন অপবিত্র নারীরা হবে অপবিত্র পুরুষদের জন্য এবং অপবিত্র পুরুষরা হবে অপবিত্র নারীদের জন্য; আর পবিত্র নারীরা হবে পবিত্র পুরুষদের জন্য এবং পবিত্র পুরুষরা হবে পবিত্র নারীদের জন্য। এই লোকেরা যা বলে, তা থেকে তারা মুক্ত হবে। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজিক।” (সূরা নূর: ২৬)

এই আয়াতের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর পূর্বাপর প্রসঙ্গ। ২৩ নম্বর আয়াতে পবিত্র, সরল-সাদাসিধে ও মুমিন নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপকারীদের কথা বলা হয়েছে। যারা তাঁদের বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ায়, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে লানত ও মহাশাস্তির কথা বলা হয়েছে।

এরপর ২৪ নম্বর আয়াতে আখিরাতের শাস্তির চিত্র তুলে ধরতে বলা হয়েছে, সেদিন মানুষের জিহ্বা, হাত ও পা তার কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। দুনিয়ায় মানুষ মুখ দিয়ে সত্যকে আড়াল করতে পারে, মিথ্যা বলতে পারে, অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা ছড়াতে পারে। কিন্তু কিয়ামতের দিন মানুষের নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গই তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। তখন মানুষের তৈরি বক্তব্য নয়, প্রকাশিত হবে তার প্রকৃত কর্ম ও পরিচয়।

২৫ নম্বর আয়াত এই বক্তব্যকে আরও পূর্ণতা দেয়: সেদিন আল্লাহ তাদের প্রাপ্য প্রতিফল সম্পূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেবেন এবং তারা জানতে পারবে যে, আল্লাহই সুস্পষ্ট সত্য। অর্থাৎ ২৩ থেকে ২৫ নম্বর আয়াতে একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে—মানুষ অপবাদ দেয়, সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে; কিন্তু কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রকৃত সত্য প্রকাশ করবেন এবং প্রত্যেককে তার প্রকৃত কর্মের ভিত্তিতে বিচার করবেন।

এরপরই এই ধারাবাহিকতায় ২৬ নম্বর আয়াত এসেছে। তাই এটিকে দুনিয়ার জীবনে স্বামী-স্ত্রীর চরিত্রগত সামঞ্জস্যের একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে পড়লে পূর্ববর্তী আয়াতগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বরং এখানে ‘খাবিস’ ও ‘তাইয়্যিব’ মানুষের প্রকৃত নৈতিক পরিচয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং শেষ বিচারে সেই পরিচয়ই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আয়াতের শেষাংশটিও এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—“এই লোকেরা যা বলে, তা থেকে তারা সেদিন পবিত্র হবে।” এই বাক্যটি আগের অপবাদের প্রসঙ্গের সাথে সরাসরি যুক্ত। মানুষের মুখের কথা কারও প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে না। একজন নিরপরাধ মানুষকে অপবাদ দিয়ে তাকে অপবিত্র বানানো যায় না। দুনিয়ার মানুষ তার সম্পর্কে যা-ই বলুক, আল্লাহর বিচারে তার প্রকৃত অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। কিয়ামতের দিন সেই সত্যই প্রকাশিত হবে।

সূরা তাকভীরের একটি আয়াত থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়:

وَإِذَا النُّفُوسُ زُوِّجَتْ

অর্থ: “যখন ব্যক্তিদের জোড়া মেলানো হবে।” (সূরা তাকভীর: ০৭)

এখানে কিয়ামতের দিনের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, দুনিয়ার জীবনে সৎ ও অসৎ মানুষ মিলেমিশে থাকতে পারে। কিন্তু আখিরাতে তা হবে না। সেদিন সৎ ও অসৎ মানুষদের আলাদা আলাদাভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হবে।

অতএব, সূরা নূরের ২৬ নম্বর আয়াতকে দুনিয়ার জীবনের সাথে সম্পর্কিত করা কোনোভাবেই সঠিক নয়। বরং আয়াতটিতে আসলে আখিরাতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *