গোপনে বিয়ে করা কি জায়েজ?

admin Avatar

বর্তমান সময়ে প্রায়শই দেখা যায় যে, অনেক ছেলে-মেয়ে যাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক থাকে, তারা পরিবার মানবে না এই ভয়ে গোপনে বিয়ে করে ফেলে। আবার অনেক পুরুষ প্রথম স্ত্রী মানবে না এই আশঙ্কায় গোপনে কোনো নারীকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই প্রেক্ষাপটে গোপন বিয়ের শরয়ী অবস্থান, ইসলামের দৃষ্টিতে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং বিয়ের হাকিকত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

ইসলামে বিয়ের বিধান কেবল যৌন সম্পর্ককে হালাল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানব সন্তানদের হেফাজত করা। যদি সমাজে অবাধ যৌনাচারকে হালাল করে দেওয়া হতো, তবে মানুষের যে সন্তান হতো, সেই সন্তানদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ থাকত না। বিয়ে মূলত একজন পুরুষ এবং একজন নারীর ওপর একটি বড় দায়বদ্ধতা চাপিয়ে দেয়, যেন তারা সন্তানদের দায়িত্ব গ্রহণ করে, পরিবার গঠন করে এবং সন্তানদের লালন-পালন করে বড় করে তোলে। সুতরাং, ইসলামে বিয়ের বিধান মানব সন্তানদের হেফাজত ও সুরক্ষার মহান উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত হয়েছে, যার মূল ভিত্তিই হলো পারস্পরিক দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা।

কিন্তু এই সম্পর্ক যদি এমনভাবে গোপনে করা হয় যে, কেউ চাইলে যেকোনো মুহূর্তে তার দায়িত্ব অস্বীকার করে ফেলতে পারে, তবে তা বিয়ের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। গোপনে বিয়ে করার পর যদি সন্তান হয় এবং পুরুষটি তা অস্বীকার করে বসে, তবে তার বিপক্ষে কোনো প্রমাণ থাকে না বা তার অস্বীকারের বিপরীতে সাক্ষ্য দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। এই অনিশ্চয়তা বিয়ের হাকিকত ও উদ্দেশ্যের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। একারণেই ইসলামের মধ্যে বিয়ে প্রকাশ্যে হওয়াকে জরুরি করা হয়েছে।

জিনার সম্পর্ক এবং বিয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যের জায়গাটিই হলো প্রকাশ্যতা। বিয়ে সব সময় প্রকাশ্যে উদযাপিত হয়, পক্ষান্তরে বিবাহবহির্ভূত জিনার সম্পর্ক অনেক সময় গোপনে হয়ে থাকে।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা মায়িদার মধ্যে যেখানে বিয়ের প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন, সেখানে পরিষ্কারভাবে ইরশাদ করেছেন:

“সতীসাধ্বী মুমিন নারী এবং আহলে কিতাব নারীদেরকে তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে যখন তোমরা তাদের মোহর প্রদান করবে। শর্ত হলো, তোমাদের নিজেদেরও পুতঃপবিত্র হতে হবে—অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া যাবে না এবং গোপনে কারও সাথে কোনো সম্পর্কে জড়ানো যাবে না।” (সূরা মায়িদা: ৫)

এখানে পুতঃপবিত্র থাকার বিপরীতে আল্লাহ তায়ালা দুটি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন:

১. অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া যাবে না।

২. গোপনে কারও সাথে কোনো সম্পর্কে জড়ানো যাবে না।

অতএব, পুতঃপবিত্র জীবনযাপনের জন্য নির্দিষ্টভাবে কোনো নারীর সাথে আইনি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে সংসার করতে হবে এবং গোপনে সম্পর্ক গড়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। গোপনে সম্পর্কে জড়ানো বিয়ের হাকিকতের পরিপন্থী এবং তা জিনারই একটি প্রকার।

বিয়েকে জনসমক্ষে প্রকাশ করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

“এই বিয়েকে তোমরা প্রকাশ করো এবং এটাকে প্রকাশ করার জন্য এটার আয়োজন মসজিদে করো আর এটার মধ্যে দফ বাজাও।” (সুনানুত তিরমিজি: ১০৮৯) 

এখানে মসজিদের মধ্যে বিয়ে করা কিংবা দফ বাজানো—এই দুটি বিষয় মূলত বিয়েকে প্রকাশ ও জানাজানি করার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এর মূল বার্তা হলো, বিয়ে কোনোভাবেই গোপনে করা যাবে না, একে সর্বসাধারণের সামনে স্পষ্ট ও দৃশ্যমান করতে হবে।

বিয়েতে দুইজন সাক্ষী থাকার যে শর্ত, তার প্রকৃত অর্থও অনুধাবন করা জরুরি। এই সাক্ষীর বিষয়টি মূলত আদালতের আইনি সুরক্ষার সাথে সম্পর্কিত। যদি কখনো সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়, কেউ যদি সম্পর্ক বা সন্তানকে অস্বীকার করে বসে এবং বিষয়টি আদালতে গড়ায়, তখন বিচারক প্রমাণ হিসেবে সাক্ষী তলব করবেন। সেই মুহূর্তে আদালতে উপস্থাপনের জন্য কমপক্ষে দুইজন সাক্ষী থাকতে হবে, যারা সাক্ষ্য দেবেন যে, তাদের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল।

আইনি এই বাধ্যবাধকতার অর্থ এই নয় যে, বিয়ের সময় কেবল দুজন মানুষকে সাক্ষী রেখে বাকি পুরো সমাজ থেকে বিষয়টিকে গোপন রাখা যাবে। বিয়ে করার সময় অবশ্যই তা জানাজানি ও প্রকাশ্যে হতে হবে; কোনো প্রকার গোপন করার চেষ্টা করা যাবে না। যদি একে গোপন করা হয়, তবে দায়বদ্ধতা না থাকা এবং পরবর্তীতে অস্বীকারের সুযোগ থাকার কারণে ইসলামের দৃষ্টিতে তা আসলে কোনো বিয়ে বলেই গণ্য হয় না।

লেখক: মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *