আমাদের দেশে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। সামাজিকতার স্বাভাবিক ধারায় বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে প্রতিবেশী, বন্ধু বা সহকর্মীরা একে অপরকে আপ্যায়ন করেন, খাবার উপহার দেন। শারদীয় দুর্গোৎসবসহ নানা পূজা-পার্বণে হিন্দু প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে মুসলিম বাড়িতে মিষ্টি, ফলমূল বা নানা ধরনের খাবার পাঠানো আমাদের সমাজে খুবই পরিচিত একটি রীতি। এই প্রেক্ষাপটে একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের জন্য জানা জরুরি, এসব খাবারের মধ্যে কোনটি গ্রহণ করা যায় আর কোনটি থেকে বিরত থাকা উচিত।
এ বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হলে প্রথমেই ‘প্রসাদ’ ও ‘সাধারণ সামাজিক আপ্যায়নের খাবার’—এই দুটোর মাঝে পার্থক্য স্পষ্ট হওয়া দরকার। পূজা-অর্চনার আনুষ্ঠানিক অংশ হিসেবে দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে যে খাদ্য উৎসর্গ করা হয়, সেটিই হলো প্রসাদ। এটি সাধারণ খাবার নয়, বরং উপাসনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামে সকল প্রকার ইবাদত ও উৎসর্গ কেবলমাত্র এক আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। তাই আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্তার নামে উৎসর্গকৃত কোনো কিছু গ্রহণ থেকে বিরত থাকা মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য। খাবারটি দেখতে হালাল উপাদানে তৈরি মনে হলেও—তা চাল, ফল বা মিষ্টিই হোক—যখন তার সঙ্গে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গের বিষয়টি যুক্ত হয়, তখন তা আর গ্রহণযোগ্য থাকে না।
এ ব্যাপারে কুরআন মাজিদে সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-মায়েদার ৩ নম্বর আয়াতে বলেন:
وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ
অর্থাৎ ‘দেব-দেবীর আস্তানায় যে পশুকে জবাই করা হয়েছে, (সেটিও হারাম)।
এই আয়াতাংশ থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হয় যে, প্রতিমার বেদিতে বা দেব-দেবীর আস্তানায় উৎসর্গ করার জন্যই পশুটি হারাম হয়েছে। তাই অন্যান্য খাবারও যদি এভাবে উৎসর্গ বা নিবেদন করা হয়, তাহলে তার ক্ষেত্রেও একই বিধান হবে।
তবে এখানে মনে রাখা জরুরি, পূজার সময় বিতরণ করা সব খাবারই প্রসাদ নয়। অনেক পরিবারই পূজা উপলক্ষে শুধু প্রতিবেশীসুলভ আন্তরিকতা ও সামাজিক সৌজন্য থেকে নিজেদের ঘরে তৈরি পিঠা-পুলি, ফলমূল বা অন্যান্য খাবার বিতরণ করে থাকেন। সেই খাবারে হারাম কোনো উপাদান না থাকলে তা গ্রহণ করতে শরিয়াতে কোনো বাধা নেই। কেবল পূজার সময় দেওয়া হয়েছে—এই কারণে ঢালাওভাবে সব খাবারকে হারাম বলা যায় না।
কোনো খাবার নিয়ে সন্দেহ হলে ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করে নেওয়া উচিত। জিজ্ঞেস করার পর যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটি প্রতিমার উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত প্রসাদ, তাহলে একজন মুসলিমের ঈমানি সতর্কতার অপরিহার্য দাবি হলো তা এড়িয়ে চলা। এক্ষেত্রে অন্য ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে মার্জিত ভাষায় নিজের অবস্থানটি বুঝিয়ে বলাই ইসলামের শিষ্টাচার।
আর মাংসজাতীয় খাবারের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী আহলে কিতাব ছাড়া অন্য কোনো অমুসলিমের জবাই করা পশুর মাংস মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়। তাই পূজা উপলক্ষে পরিবেশিত কোনো মাংসজাতীয় খাবার গ্রহণের আগে তার শরয়ি বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply