আমাদের দেশের আইনি কাঠামোর দিকে তাকালে আইনি দায়বদ্ধতা, সম্মতির বয়স আর বিয়ের ন্যূনতম বয়সের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি চোখে পড়ে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়সে একজন নাগরিক প্রাপ্তবয়স্ক হন এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি ক্ষেত্রে পূর্ণ আইনি দায়বদ্ধতার মুখোমুখি হন। এর ফলে ১৬ বা ১৭ বছর বয়েসী অনেক তরুণ গুরুতর অপরাধ করেও শিশু আইন ও কিশোর বিচারব্যবস্থার নমনীয়তার সুযোগে মূল শাস্তি থেকে ছাড় পেয়ে যায়। অন্যদিকে, বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর হলেও ছেলেদের জন্য তা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ বছর। আবার দৈহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতির বয়স ধরা হয়েছে ১৬ বছর।
অর্থাৎ, অপরাধের দায় বহনে ছাড়, সম্মতি প্রদান আর পরিবার গঠনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে রাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন বয়সের মানদণ্ড প্রয়োগ করছে। বিশেষ করে, সম্মতির বয়স (১৬ বছর) এবং বিয়ের বয়সের (মেয়েদের ১৮ ও ছেলেদের ২১ বছর) মধ্যকার এই পার্থক্য তরুণদের এক কঠিন নৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দেশের প্রচলিত আইনে ১৬ বছর বয়সে বিবাহবহির্ভূত সম্মতিসূচক সম্পর্ক কোনো অপরাধ নয়। অর্থাৎ, ১৬ বছর বয়েসী তরুণ-তরুণী যদি অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়, তবে আইন তাদেরকে বাধা দেয় না। কিন্তু সেই একই ছেলে বা মেয়ে যদি অনৈতিক পথ ছেড়ে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়, তবে আইন তাকে ‘বাল্যবিয়ে’ হিসেবে গণ্য করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বানিয়ে দেয়! ছেলেদের ক্ষেত্রে এই সীমা ২১ বছর হওয়ায় তাদের জন্য বাধাটি আরও দীর্ঘ। যে বয়সে দৈহিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের কারণে সম্পর্ক গড়ে ওঠা স্বাভাবিক, সে বয়সে আইন পবিত্র বৈবাহিক সম্পর্ককে কঠিন করে কার্যত ব্যভিচারের পথকেই উন্মুক্ত করে রেখেছে।
একজন ছেলে সাধারণত ১১ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এবং একজন মেয়ে ১০ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছায়। এরপর নিজের ভালো-মন্দ অনুধাবন করার মতো ন্যূনতম বিচারবুদ্ধি তৈরি হতে আরও এক-দুই বছর সময় লাগে। অর্থাৎ, ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সের মধ্যেই একজন কিশোর বা কিশোরী জীবনের মৌলিক বিষয়গুলোতে নিজস্ব ভালো-মন্দ বিবেচনা করার সক্ষমতা অর্জন করে।
পবিত্র কুরআনের সুরা নিসার ৬ নম্বর আয়াতে প্রাপ্তবয়স্কতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা সম্পর্কে একটি সুন্দর নীতি তুলে ধরা হয়েছে:
وَابْتَلُوا الْيَتَامَىٰ حَتَّىٰ إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُم مِّنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ ۖ
“তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করতে থাকো, যতক্ষণ না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছায়। অতঃপর যদি তাদের মধ্যে ভালো-মন্দ বোঝার সক্ষমতা দেখতে পাও, তবে তাদের ধন-সম্পদ তাদের হাতে বুঝিয়ে দাও।”
কুরআনের এই আয়াতে দুটি মানদণ্ড তুলে ধরা হয়েছে—প্রথমটি ‘বুলুগ’ বা বিয়ের উপযুক্ত শারীরিক সক্ষমতা, এবং দ্বিতীয়টি ‘রুশদ’ বা নিজস্ব ভালো-মন্দ বোঝার মানসিক সচেতনতা।
কুরআন আমাদের শেখায়, শারীরিক পূর্ণতার পাশাপাশি যখন ভালো-মন্দের বোধ তৈরি হয়, তখনই একজন মানুষ তার নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে এবং তার ওপর আইনি দায়বদ্ধতা বর্তায়। মানুষের স্বাভাবিক বিকাশ অনুযায়ী ১৫-১৬ বছর বয়সেই এই শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক যোগ্যতার চমৎকার মিলন ঘটে।
অতএব, আমাদের আইনি ব্যবস্থায় একটি সমন্বিত ও সুসংহত সংশোধন আনা এখন সময়ের দাবি। অপরাধ করে ১৬-১৭ বছর বয়সে আইনি ছাড় পাওয়ার পথ বন্ধ করতে এবং মানুষের স্বাভাবিক ভালো-মন্দ বোঝার বয়সের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি একক মানদণ্ড দাঁড় করানো উচিত। অপরাধ বা চুক্তির আইনি দায়বদ্ধতা, সম্মতির বয়স এবং ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স—সবক্ষেত্রেই ১৫ বা ১৬ বছরকে সর্বনিম্ন আইনি বয়সসীমা হিসেবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এতে করে একদিকে যেমন অপরাধ করে কম বয়সের অজুহাতে পার পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হবে, অন্যদিকে তরুণ সমাজ অনৈতিক সম্পর্কের পথ থেকে সুরক্ষিত হবে এবং সমাজে একটি সুশৃঙ্খল ও নীতিগত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা পাবে।
মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply