ইসলামে মদ্যপানের শাস্তি কী? 

admin Avatar

মদ্যপানের শাস্তি হিসেবে আশিটি বা চল্লিশটি বেত্রাঘাত আমাদের প্রচলিত ফিকহে একটি প্রতিষ্ঠিত মত। সাধারণভাবে এটিকে শরিয়ার বিধান হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে শরিয়ার মূলনীতি এবং মদ্যপানের শাস্তি নির্ধারণের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মদ্যপানের শাস্তি হিসেবে আশিটি বা চল্লিশটি বেত্রাঘাতকে শরিয়ার নির্ধারিত বিধান বলা সঙ্গত নয়। মদ্যপান হারাম হওয়া কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ, কিন্তু এর শাস্তি নির্ধারণের বিষয়টি ভিন্ন একটি বিষয়।

কোনো বিষয় শরিয়ার বিধান হতে হলে তা কুরআন বা সুন্নাহে শরিয়ার বিধান হিসেবে নির্ধারিত হতে হবে। অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে পাঁচটি অপরাধের জন্য কুরআন নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান দিয়েছে। সেই অপরাধগুলো হলো: হত্যা বা আঘাত, সামাজিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ব্যভিচার, ব্যভিচারের অপবাদ এবং চুরি।

এর বাইরে অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে কুরআন বা সুন্নাহে নির্দিষ্টভাবে কোনো শাস্তির বিধান দেওয়া হয়নি। তাই, এগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও শাসকের দায়িত্ব হলো অপরাধের প্রকৃতি, সামাজিক ক্ষতি, জননিরাপত্তা, অপরাধের ব্যাপকতা এবং সংশোধনের প্রয়োজন বিবেচনা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে এসব শাস্তির ধরন ও মাত্রাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

মদ্যপানের বিষয়টি এই মূলনীতির আলোকে দেখলে স্পষ্ট হয়। কুরআনে মদ্যপান থেকে বিরত থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে এবং একে অপবিত্র ও শয়তানের কাজ হিসেবে উল্লেখ করে তা পরিহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মদ্যপানের জন্য কুরআন নির্দিষ্ট কোনো শাস্তির বিধান দেয়নি। এমনকি হাদিসেও শরিয়াতের বিধান হিসেবে এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো শাস্তি বর্ণিত হয়নি।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মদ্যপানের অপরাধে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন হাদিসে এর বিভিন্ন ধরন বর্ণিত হয়েছে। কোথাও জুতা দিয়ে, কোথাও লাথি-কিল-ঘুষি দিয়ে এবং কোথাও খেজুরের ডাল দিয়ে প্রহার করার কথা এসেছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি বা নির্দিষ্ট সংখ্যক বেত্রাঘাতকে স্থির করে দেওয়া হয়নি।

পরবর্তীকালে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর আমলে মদ্যপানের জন্য চল্লিশটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করা হয়। এরপর হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে যখন মদ্যপানের প্রবণতা বেড়ে যায়, তখন তিনি সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং শাস্তির পরিমাণ আশিটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন। ইবনে রুশদ বিদায়াতুল মুজতাহিদ-এ উল্লেখ করেছেন, হজরত আলী (রা.) মদ্যপানের শাস্তিকে ব্যভিচারের অপবাদের শাস্তির সঙ্গে তুলনা করে আশিটি বেত্রাঘাতের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল—মদ্যপানকারী মাতাল হয়ে অসংলগ্ন কথা বলে এবং এর ফলে অন্যের ওপর অপবাদ আরোপের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। (বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ২/৩৩২)

যদি আশিটি বা চল্লিশটি বেত্রাঘাত শরিয়ার নির্ধারিত বিধান হত, তাহলে তা এভাবে পরামর্শ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হত না। কোনো সাহাবি নিজের সিদ্ধান্তে বা অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে শরিয়ার বিধান প্রবর্তন করতে পারেন না। শরিয়ার বিধান প্রবর্তনের এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরে কিয়ামত পর্যন্ত এই এখতিয়ার কারও নেই।

এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাসক হিসেবে ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শরিয়ার বাহক; একই সঙ্গে তিনি মুসলিম সমাজের শাসকও ছিলেন। ফলে তাঁর প্রশাসনিক কার্যক্রম বা সিদ্ধান্তকে শরিয়ার বিধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যেসব বিষয়কে তিনি শরিয়ার বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, তা কুরআন এবং সুন্নাহে শরিয়ার বিধান হিসেবেই নির্ধারিত ও প্রতিষ্ঠিত।

এজন্য আমরা মনে করি, মদ্যপানের শাস্তি সম্পর্কিত প্রচলিত ফিকহি মতটির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

কোনো অপরাধের জন্য শরিয়াতে নির্দিষ্ট শাস্তি না থাকলেও রাষ্ট্রের শাসক ও আইনপ্রণেতাগণ মানুষের অধিকার ও সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন। মদ্যপান যেহেতু ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর, তাই রাষ্ট্র পরিস্থিতি অনুযায়ী এর জন্য উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণ করবে। সেই শাস্তি বেত্রাঘাত হতে পারে, আবার অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও হতে পারে—এটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সময়ের সামাজিক বাস্তবতা ও রাষ্ট্রের নীতির ওপর।

মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *