ইসলামের পরিচয় দিতে গিয়ে আমরা প্রায়শই বলি, ‘ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান।’কথাটি বহুল প্রচলিত হলেও এর অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। কারণ এই বাক্যটি অনেক সময় এমন একটি ধারণার জন্ম দেয় যে, রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, সমাজ ও পরিবার—এক কথায় মানুষের জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ইসলাম একটি চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় কাঠামো দিয়েছে। অথচ কুরআন ইসলামের উদ্দেশ্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে।
কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, নবী-রাসুলদের মূল কাজ ছিল মানুষকে পরকাল সম্পর্কে সতর্ক করা এবং সুসংবাদ দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“সকল মানুষ একই সম্প্রদায় ছিল। এরপর (তাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে, তখন) আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছেন; আর তাঁদের সাথে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তরূপে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যাতে এই কিতাব মানুষের মধ্যে তাদের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত দেয়।” (সূরা বাকারা ২:২১৩)
এই আয়াতে নবীদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘মুবাশশিরীন ও মুনযিরীন’—অর্থাৎ সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে। এখান থেকে স্পষ্ট যে, নবীদের মূল মিশন ছিল মানুষকে পরকালীন জবাবদিহি সম্পর্কে সচেতন করা এবং মুক্তির পথ দেখানো; কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মডেল প্রবর্তন বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ তাঁদের মিশন ছিল না।
পরকালীন সফলতার এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই ইসলামের কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য হলো তাজকিয়া—অর্থাৎ মানুষের সার্বিক পরিশুদ্ধি। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“নিশ্চয়ই সফল হয়েছে সে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।” (সূরা শামস ৯১:৯)
এই পরিশুদ্ধি কেবল অন্তরের নয়; বরং মানুষের সমগ্র ব্যক্তিত্বের। তাই ইসলাম শরীরের পবিত্রতা, পানাহারের পবিত্রতা এবং সর্বক্ষেত্রে নৈতিক ও চারিত্রিক পবিত্রতার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। মানুষের বিশ্বাস, ইবাদত, পারিবারিক জীবন, সামাজিক আচরণ এবং অন্য মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক—সবকিছুকে ইসলাম এমনভাবে গড়ে তুলতে চায়, যাতে সে আল্লাহর সামনে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়ে উপস্থিত হতে পারে।
অতএব, ইসলামের পূর্ণতা মূলত এই তাজকিয়া তথা সার্বিক পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রেই। মানুষকে পরকালীন সফলতার উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, ইসলাম তার পূর্ণাঙ্গ হেদায়েত দিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পরিবর্তনশীল মানবসমাজের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইসলাম সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দিয়েছে।
কুরআন এসব ক্ষেত্রে কিছু শাশ্বত নৈতিক নির্দেশনা ও বিধান দিয়েছে—ন্যায়বিচার, আমানতদারিতা, পরামর্শ, সততা, জুলুমের নিষেধ, প্রতারণার নিষেধ, সুদ ও জুয়ার নিষেধ ইত্যাদি। কিন্তু সেই নীতিগুলোকে সামনে রেখে যুগে যুগে কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, তা মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পরামর্শ এবং বাস্তব প্রয়োজনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
একারণেই ইসলামকে ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান’ বলার চেয়ে ‘পরকালের সাফল্যের জন্য পূর্ণাঙ্গ হেদায়েত’ বলা অধিক নির্ভুল ও কুরআনের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান’ কথাটি অনেকের মনে এই ধারণা তৈরি করে যে, মানবসভ্যতার প্রতিটি পরিবর্তনশীল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও ধর্ম নির্ধারণ করে দিয়েছে। অথচ ইসলামের লক্ষ্য মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট যুগের বা সভ্যতার কাঠামোয় আবদ্ধ করা নয়; বরং তাকে এমন নৈতিক ভিত্তি প্রদান করা, যার আলোকে সে প্রতিটি যুগে ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণকর সমাজ গড়ে তুলতে পারে। ইসলামের সর্বজনীনতা ও চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতাও এখানেই নিহিত।
লেখক: মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply