বদনজর আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি বিশ্বাস। অনেকেই এটিকে ধর্মীয় বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন, আবার কেউ এটিকে নিছক লোকবিশ্বাস বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বদনজর সত্যিই ইসলামের কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস, নাকি এটি মূলত মানুষের অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার অন্তর্গত একটি ধারণা?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে একটি মৌলিক নীতি বুঝতে হবে: নবীদের ওহিভিত্তিক জ্ঞান এবং পার্থিব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান এক জিনিস নয়।
দ্বীন ও শরিয়তের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিটি বক্তব্য ওহির নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত এবং নির্ভুল। কিন্তু কৃষি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি বা অন্যান্য জাগতিক বিষয়ে তিনি একজন মানুষ হিসেবেই কথা বলেছেন—যেখানে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও অনুমানের ভূমিকা ছিল স্বাভাবিক।
এই পার্থক্যের সবচেয়ে স্পষ্ট দলিল হলো খেজুর গাছের পরাগায়নের ঘটনা।
মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখলেন, কৃষকেরা কৃত্রিমভাবে খেজুর গাছে পরাগায়ন করছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মত দিলেন—এটি না করলেও হয়তো ভালো হতো। সাহাবিগণ তাঁর কথাকে দ্বীনি নির্দেশ মনে করে পরাগায়ন বন্ধ করে দিলেন। ফলে সে বছর ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন:
“তোমরা তোমাদের দুনিয়াবি বিষয়গুলো আমার চেয়ে বেশি ভালো জানো।” (সহিহ মুসলিম, ২৩৬৩)
অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন:
“ধর্মীয় বিষয়ে আমি যা বলি, তা গ্রহণ করো। আর নিজের পক্ষ থেকে (পার্থিব বিষয়ে) কিছু বললে, আমি তো একজন মানুষ।” (সহিহ মুসলিম, ২৩৬১)
এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয়—ওহির বিষয় এবং পার্থিব অভিজ্ঞতার বিষয় এক নয়। এই নীতির আলোকে বদনজরকে দেখলে বিষয়টি একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আরব সমাজে বদনজরের ধারণা প্রচলিত ছিল। এছাড়াও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় দোয়া, ঝাড়ফুঁক ও বিভিন্ন লোকজ পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। এগুলো মূলত তৎকালীন সমাজের অভিজ্ঞতালব্ধ চিকিৎসা ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার অংশ ছিল।
অতএব, বদনজরকে ওহিভিত্তিক ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি বিষয়, যার মূল্যায়ন হবে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার আলোকে।
আধুনিক বিজ্ঞান যদি এর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তাতে ইসলামের মৌলিক সত্যের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।
বদনজরের মতো বিষয়গুলোকে তাই ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গে একাকার করা উচিত নয়। বরং এগুলোকে সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবীয় অভিজ্ঞতার পরিমণ্ডলে বিচার করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।
লেখক: মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply