ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি ও ধর্ষণ কীভাবে প্রমাণিত হয়?

admin Avatar

ধর্ষণ অত্যন্ত ঘৃণ্য ও মারাত্মক একটি সামাজিক অপরাধ। এর মাধ্যমে জোরপূর্বক একজন মানুষের সম্ভ্রমহানি করা হয় এবং তার ইজ্জত ও সম্মানের ওপর নির্মমভাবে আক্রমণ চালানো হয়। সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই অপরাধের সুষ্ঠু বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ধর্ষণ কখনো পারস্পরিক সম্মতিতে ঘটা সাধারণ জিনা বা ব্যভিচারের মতো নয়। তাই ধর্ষণ প্রমাণিত হওয়ার জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর প্রয়োজন নেই। পবিত্র কুরআনে জিনা বা ব্যভিচার প্রমাণের জন্য যে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে, তা মূলত সাধারণ জিনার জন্য বলা হয়েছে। সাধারণ জিনার ক্ষেত্রে কেউ সরাসরি ভুক্তভোগী বা নির্যাতিত হয় না, কারণ তা উভয়ের সম্মতিক্রমেই ঘটে থাকে। কিন্তু ধর্ষণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একজন ব্যক্তি বলপ্রয়োগের শিকার হন এবং অপরজনের দ্বারা নির্যাতিত হন। তাই ধর্ষণের মামলাটিকে জিনা হিসেবে না দেখে অন্যান্য সাধারণ অপরাধের মতোই বিবেচনা করতে হবে।

ধর্ষণ প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রথমে ভুক্তভোগী অভিযোগ দায়ের করবেন। এরপর ধর্ষণের সপক্ষে সব ধরনের প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক আলামত পরীক্ষা করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে শরীরের আঘাত, ভিডিও ফুটেজ কিংবা ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট ইত্যাদি। শরিয়ত এখানে প্রমাণের কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা সীমা বেঁধে দেয়নি, বরং অপরাধ নিশ্চিত হওয়ার জন্য যেকোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণকেই আদালতে আমলে নেওয়া হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবন থেকে আমরা এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ পাই। সুনানে আবু দাউদের ৪৩৭৯ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এক নারী মসজিদে যাওয়ার সময় ধর্ষণের শিকার হন। পরবর্তীতে সেই নারীর অভিযোগ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই ধর্ষকের ওপর ‘রজম’ বা পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি প্রয়োগ করেছিলেন। এই ঘটনার বিচার করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ভুক্তভোগী নারীর কাছে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী দাবি করেননি।

ধর্ষণের শাস্তি সাধারণ জিনার মতো কেবল ১০০ বেত্রাঘাত নয়। এর কারণ হলো, ধর্ষণের মাধ্যমে অপরাধী মূলত দুটি অপরাধ একসাথে করে থাকে। প্রথমত সে জিনা বা ব্যভিচার করে এবং দ্বিতীয়ত সে জোরপূর্বক অপর একজন মানুষের ওপর আক্রমণ করে তার সম্ভ্রমহানি করে। এই জোরপূর্বক অপরাধটি আসলে সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি বা ‘ফাসাদ ফিল আরদ’-এর শামিল।

তাই ধর্ষণের ক্ষেত্রে ‘ফাসাদ ফিল আরদ’-এর শাস্তি প্রয়োগ করতে হয়, যা পবিত্র কুরআনের সুরা মায়িদার ৩৩ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন:

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, তাদের শাস্তি কেবল এটাই যে, তাদেরকে হ*ত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে, কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কে*টে ফেলা হবে অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে।”

অপরাধের মাত্রা এবং অপরাধীর অবস্থা বিবেচনা করে বিচারক এই চারটি শাস্তির যেকোনো একটি প্রয়োগ করতে পারেন। দৃষ্টান্তমূলকভাবে হত্যা করার একটি রূপ হলো ‘রজম’ বা পাথর ছুড়ে হত্যা করা, যা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে প্রয়োগ করেছিলেন।

তবে বিচারক যদি মৃত্যুদণ্ড বা শূলে চড়ানোর শাস্তি না দিয়ে অন্য কোনো শাস্তি দেন, তবে ক্ষেত্রবিশেষে ‘ফাসাদ ফিল আরদ’-এর শাস্তির পাশাপাশি জিনার শাস্তি হিসেবে ১০০ বেত্রাঘাতও এর সাথে যোগ হতে পারে। কিন্তু অপরাধীকে যদি সরাসরি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তবে অন্য কোনো শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

ইসলামি বিধান অনুযায়ী ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীকে কখনোই অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না বা কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না। কারণ তিনি পরিস্থিতির শিকার এবং বলপ্রয়োগের কারণে তার কোনো অপরাধ নেই। বরং ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে, যাতে তার ক্ষতি কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হয়।

ইসলামে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিচার অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট। চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর দোহাই দিয়ে এই অপরাধকে আড়াল করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। বরং আধুনিক ডাক্তারি পরীক্ষা, পারিপার্শ্বিক আলামত এবং ন্যায়সংগত প্রমাণের ভিত্তিতে ধর্ষককে কঠোরতম শাস্তি দেওয়ার বিধান ইসলাম নিশ্চিত করেছে, যাতে সমাজে মানুষের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা পায়।

মাওলানা উমর ফারুকের লেকচারের আলোকে

লেখক: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *