ইচ্ছার ও পছন্দের স্বাধীনতা এই পৃথিবীতে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সম্মান। কিন্তু এই স্বাধীনতার একটি অনিবার্য ফল হলো, এর অপব্যবহারের কারণে অনেক সময় পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। মানব ইতিহাসে এই বিশৃঙ্খলার প্রথম প্রকাশ ঘটে মানবজাতির আদি পিতা আদমের ছেলে কাবিলের হাতে। তাই, তখন থেকেই এই প্রয়োজন সামনে আসে যে, মানুষকে মানুষের অনিষ্ট ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থা থাকা উচিত। অপরাধ ও শাস্তির সমস্ত নিয়ম-কানুন এই প্রয়োজন থেকেই তৈরি হয়েছে। এসবের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশৃঙ্খলা নির্মূল করা, এবং সেটাই হওয়া উচিত। কিন্তু যারা আল্লাহর হেদায়েত গ্রহণ করে এবং তাঁর রাসুলদের প্রতি ঈমান আনে, তাদের বিষয়টি সাধারণ অপরাধীদের মতো নয়। কুরআন থেকে জানা যায় যে, যদি তারা জীবন, সম্পদ, সম্মান বা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে কোনো বড় অপরাধ করে, তাহলে আল্লাহর সিদ্ধান্ত হলো, তাদের এই পৃথিবীতেই শাস্তি দেওয়া হবে, যাতে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আল্লাহর এই শাস্তি দেখে পরকালের শাস্তির কথা স্মরণ করতে পারে। উপরন্তু, যদি অপরাধীরা তওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে, তবে এই শাস্তি তাদের পাপ থেকে পবিত্রতার মাধ্যম হবে।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সময়কার দাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন যে, পারিবারিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ নৈতিক শিক্ষার কারণে তাদেরকে শরিয়া নির্ধারিত ব্যভিচারের শাস্তি দেওয়া যাবে না। এমনকি, যদি তাদের মালিক ও স্বামীরা তাদের পবিত্র রাখার পুরোপুরি ব্যবস্থা করে, তবুও তাদের এই শাস্তির তুলনায় অর্ধেক শাস্তি দেওয়া হবে। অর্থাৎ, একশো বেত্রাঘাতের পরিবর্তে পঞ্চাশটি বেত্রাঘাত করা হবে। (সুরা নিসা: ২৫)
এই শাস্তিগুলো যেভাবে দেওয়া হয়, তা সবসময় কঠোর। এর কারণ হলো, এই শাস্তিগুলোর উদ্দেশ্য কেবল অপরাধ নির্মূল করা নয়, বরং এগুলোর উদ্দেশ্য এটাও যে, বিশেষ কিছু লোককে আল্লাহর শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করানো হবে এবং অন্যদের জন্য তাদেরকে শিক্ষণীয় করে তোলা হবে। এই বিশেষ লোকেরা কারা? যারা পূর্ণ সচেতনতার সাথে নিজেদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের কাছে সমর্পণ করেছে, আনুগত্যের শপথ নিয়েছে, রাসুলদের দ্বীনকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং এরপর বড় কোনো অপরাধে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে যে, বিষয়টি আর গোপন থাকেনি, বরং আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
এজন্যই চুরির শাস্তি বর্ণনা করার পর আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
جَزَآءًۢ بِمَا كَسَبَا نَكَـٰلًۭا مِّنَ ٱللَّهِ
“তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে।” (সুরা মায়িদা: ৩৮)
অর্থাৎ, এটি কাজের প্রতিফল এবং এর পাশাপাশি অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়ও, যাতে তারা এই শাস্তি দেখে বুঝতে পারে যে, আল্লাহর শাস্তি যদি দুনিয়াতে এমন হয়, তাহলে পরকালে তিনি তাঁর অবাধ্যদের সাথে কেমন ব্যবহার করবেন। সুতরাং, দুনিয়ার লোভে নিজের পরকাল নষ্ট করা উচিত নয়।
শরিয়াতে যে অপরাধগুলোর শাস্তি নির্ধারিত, সেগুলো হলো:
১. বিদ্রোহ ও দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি
২. হত্যা ও জখম
৩. ব্যভিচার
৪. ব্যভিচারের অপবাদ
৫. চুরি
এইসব অপরাধের জন্য শরিয়া আসলে সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারিত করেছে। এইসব অপরাধের লঘু মাত্রার শাস্তি এবং এগুলো ছাড়া অন্যসব অপরাধের শাস্তির বিষয়টি আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের আইন প্রণেতাদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে তারা এই বিষয়ে যে কোনো আইন তৈরি করতে পারেন। তবে, এতেও এই বিষয়টি মীমাংসিত যে, কুরআনের মতে, হত্যা এবং দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ছাড়া অন্য কোনো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না। আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, যখন বনি ইসরাইলকে শরিয়া দেওয়া হয়েছিল, তখনই লিখে দেওয়া হয়েছিল যে, এই দুটি অপরাধ ছাড়া, কারো প্রাণ হরণের অধিকার কোনো ব্যক্তি বা সরকারের নেই।
সুরা মায়িদায় বলা হয়েছে:
“কোনো মানুষকে হত্যা অথবা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধ না করা সত্ত্বেও যে কোনো মানুষকে হত্যা করল সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করল।” (সুরা মায়িদা ৫: ৩২)
লেখক: উমর ফারুক
তথ্যসূত্র: ‘মিজান’ বইয়ের দণ্ডবিধি অধ্যায়, উস্তাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি

Leave a Reply