মানুষের হাতে অনেক সময় অলস টাকা পড়ে থাকে কিংবা চাকরি শেষে অনেকে পেনশনের টাকা পান। সেই অর্থ তারা কোথায় বিনিয়োগ করবেন তা নিয়ে তারা অনেক সময় চিন্তিত থাকেন। এই অলস টাকা বিনিয়োগের জন্য সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো সঞ্চয়পত্র। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা সুদের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিয়ে অনেকের মনে দ্বিধা রয়েছে।
সঞ্চয়পত্র মূলত সরকারের একটি বিশেষ স্কিম, যা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা করে। তবে যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমেই এতে বিনিয়োগ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছ থেকে এককালীন টাকা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে এবং তা দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করে। একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সরকার বিনিয়োগকারীকে আসলের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট হারে মুনাফা প্রদান করে। এই মুনাফা মাসিক, ত্রৈমাসিক, বার্ষিক কিংবা মেয়াদ শেষে এককালীন দেওয়া হতে পারে।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কি সুদ?
ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফাকে সরাসরি সুদের অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো, এই ঋণের শর্তগুলো ঋণদাতা (জনগণ) নির্ধারণ করে না, বরং ঋণগ্রহীতা (সরকার) নিজেই নির্ধারণ করে। সরকার তার নিজ সিদ্ধান্তে মুনাফার হার ঠিক করে এবং অনেক সময় তা কম-বেশিও করে থাকে।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, কোনো ঋণগ্রহীতা যদি স্বেচ্ছায় ঋণদাতার অনুগ্রহের কথা চিন্তা করে ঋণের অতিরিক্ত কিছু প্রদান করে, তবে তা জায়েজ। সঞ্চয়পত্রের মুনাফাও অনেকটা সেরকমই, যেখানে সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে বিনিয়োগকারীকে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও ঋণ পরিশোধের সময় পাওনার চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে দিতেন, যা তাঁর উচ্চ নৈতিক চরিত্র ও মহানুভবতার পরিচয় দেয়। এই প্রসঙ্গে সাহাবি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে:
“জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আমার কিছু পাওনা ছিল। তিনি যখন তা পরিশোধ করলেন, তখন আমাকে আসলের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু বাড়িয়ে দিলেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৪৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭১৫)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ঋণদাতা শর্ত আরোপ না করলে এবং ঋণগ্রহীতা নিজের খুশি মতো অতিরিক্ত কিছু দিলে তা ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বৈধ।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফাকে সরাসরি সুদ বলার সুযোগ নেই। তবে যাদের খুব বেশি প্রয়োজন নেই, তাদের জন্য এটি থেকে বিরত থাকা উত্তম। কিন্তু অভাবগ্রস্ত, বিধবা কিংবা এতিম—যারা এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ও এর মুনাফা গ্রহণ নাজায়েজ হবে না এবং আশা করা যায়, এর জন্য আল্লাহর কাছে তাদের জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে না।
মাওলানা উমর ফারুকের লেকচারের আলোকে
লেখক: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply