আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি কি চিরকাল জাহান্নামে থাকবে?

admin Avatar

এই দুনিয়াতে মানুষ বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। কখনো কখনো পরিস্থিতি মানুষকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, সে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ খুঁজে পায় না, মানসিক যন্ত্রণা তার জীবনকে বিষিয়ে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ অনেক সময় আত্মহত্যা করে বসে। এখানেই প্রশ্ন আসে যে, আল্লাহ কি এমন ব্যক্তিকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তি দিবেন? যদি দেন তাহলে কেন দিবেন?

এই প্রশ্নের উত্তরে তিনটি বিষয় ভালোভাবে বুঝতে হবে:

১. মহান আল্লাহ এই পৃথিবীতে মানুষের পরীক্ষা নিচ্ছেন। মানুষের জীবনে যেসব কঠিন পরিস্থিতি আসে, তা আসলে এই পরীক্ষার জন্যই আসে। আর মানুষের নিজের জীবনটাও তার নিজস্ব কোনো অর্জন নয়, বরং এটা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন এই দুনিয়াতে তার পরীক্ষার নেওয়ার জন্যই। সুতরাং, মানুষ চাইলেই নিজের জীবন শেষ করে দিতে পারে না। যারা এটা করে তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লারহ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের জীবনকে পবিত্রতা ও সম্মান দিয়েছেন, সেটা অন্যের জীবন হোক বা নিজের জীবন। তাই যেভাবে অন্যের জীবন কেড়ে নেওয়া একটি বড় অপরাধ, ঠিক তেমনিভাবে নিজের জীবন কেড়ে নেওয়াও সমান অপরাধ। এটাও আসলে মানবহত্যাই। আর কুরআন বলে, মানবহত্যার শাস্তি হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম। (সুরা নিসা: ৯৩)

২. কুরআন মাজিদ আমাদের জানিয়েছে, যখনই মানুষ কোনো অপরাধ, পাপ বা ভুল কাজ করে, তখন শাস্তির আগে এটি দেখা হবে যে, অপরাধটি কীভাবে হয়েছে এবং কোন পরিস্থিতিতে হয়েছে। আল্লাহ এই দুনিয়াতে আমাদের যে আইন দিয়েছেন, তাতেও এই দুটি বিষয় দেখা জরুরি এবং কিয়ামতের দিনও আল্লাহ এগুলো দেখবেন।

সুতরাং, তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, ডিপ্রেশন বা মানিসক অসুস্থতা কিংবা পরিস্থিতির চাপ বা পরিবেশের ভুল প্ররোচনা—এসবের কারণে মানুষ যদি আত্মহত্যা করে থাকে তাহলে কিয়ামতের দিন এই প্রত্যেকটির জন্যই তার শাস্তির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে।

কুরআন মাজিদ নিজেই এই বিষয়টি বর্ণনা করেছে। কুরআন নাজিলের সময়ে যেসব বাঁদীকে তাদের মনিবরা ব্যভিচারে বাধ্য করত, তাদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে— তাদের পবিত্র থাকার ইচ্ছা সত্ত্বেও যদি তাদেরকে বাধ্য করা হয় তাহলে এই বাধ্য করার পর আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সুরা নুর: ৩৩)

তবে তার মানে এই নয় যে, অপরাধ আর অপরাধই থাকেনি। মানুষ কোনো অপরাধ করলে সে একজন অপরাধী হিসেবেই কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে উপস্থিত হবে। এরপর আল্লাহ তার পরিস্থিতি, তার মানসিক অবস্থা সবকিছুই বিবেচনা করবেন।

৩. ছাড় ঠিক ততটাই দেওয়া হবে, যতটা সে বাধ্য হয়েছিল বা চাপের মধ্যে ছিল। এর মধ্যে কিছু বিষয় আছে যা আমরা এই দুনিয়াতেও বুঝতে পারি, আর কিছু বিষয় মানুষের ভেতরের অবস্থার সাথে সম্পর্কিত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সেদিন মানুষের ভেতরের অবস্থাও সামনে নিয়ে আসা হবে। (সুরা আদিয়াত: ১০)

অর্থাৎ, তার চেতনা কেমন ছিল, মানসিক চাপের তীব্রতা কতটা ছিল, তার ইচ্ছাশক্তি কেমন ছিল—সবকিছু বের করে তার সামনে টেবিলে রাখা হবে। এরপর যখন সে নিজে স্বীকার করবে যে, আমি এই কাজটি নিজের ইচ্ছায় করেছি, কিন্তু এর এতটুকু অংশ পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে করেছি, তখন সেই পরিস্থিতি অনুযায়ী তাকে ছাড় দেওয়া হবে। এই সম্ভাবনাও রয়েছে যে, তাকে পুরোপুরি ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

শুধু আত্মহত্যা নয়, যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে এই তিনটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *