জাকাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ফরজ বিধান। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র, উৎপাদন বা ব্যবসার উপায়-উপকরণ ও সরঞ্জাম এবং সর্বনিম্ন সীমার (নিসাব) চেয়ে কম সম্পদে জাকাত আসে না। এগুলো ছাড়া একজন মুসলমানের সকল সম্পদেই বিভিন্ন হারে জাকাত আসে।
কাগজের নোট চালু হওয়ার আগে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে পৃথিবীতে স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন ছিল। এছাড়া সোনা বা রুপার বারও অনেকেই সঞ্চয় হিসেবে রাখত। সোনা ও রুপার এই মুদ্রা বা বার সর্বনিম্ন সীমা (নিসাব) পূর্ণ করলে নিশ্চিতভাবেই তাতে জাকাত প্রজোয্য। কারণ এগুলো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র নয়, কিংবা ব্যবসা ও উৎপাদনের সরঞ্জামও নয়।
কিন্তু এই সোনা বা রুপার তৈরি বিভিন্ন ধরনের গয়না যখন নারীরা অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেন তখন তার জাকাত দিতে হবে কি না, এটা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
হানাফি ফকিহদের মত হলো, নারীদের ব্যবহারের গয়নায়ও জাকাত দিতে হবে, যদি তা সোনা বা রুপার হয় এবং যদি তা সর্বনিম্ন সীমা (নিসাব) পূর্ণ করে। (সোনার সর্বনিম্ন সীমা সাড়ে সাত ভরি এবং রুপার সর্বনিম্ন সীমা সাড়ে বায়ান্ন ভরি)। তাঁদের মতে সঞ্চিত সম্পদ হিসেবে তাতে বার্ষিক ২.৫% হারে জাকাত দিতে হবে।
হানাফিগণ এ ক্ষেত্রে গয়না তৈরির মূল উপাদানের দিকে লক্ষ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, এটি তো সেই একই ধাতু থেকে তৈরি হয় যা থেকে মুদ্রা বা বার তৈরি হয়। তাই তাঁরা সোনা-রুপার বার ও মুদ্রার মতো ব্যবহারের গয়নায়ও জাকাত দিতে হবে বলে মত দিয়েছেন। এছাড়াও তাঁরা এ ক্ষেত্রে কিছু হাদিস পেশ করে থাকেন, যেগুলোর মধ্যে একটিও সনদের দিক থেকে সহিহ নয়।
অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম ও ফকিহদের (মালিকি, শাফিয়ি ও হাম্বলি) মত হলো, নারীদের ব্যবহারের গয়নায় কোনো জাকাত নেই, যদিও তা সোনা বা রুপার হয়। কারণ জাকাতের ক্ষেত্রে সুন্নাতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র জাকাতের আওতামুক্ত। যেমন ব্যক্তিগত ব্যবহারের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ও যানবাহন ইত্যাদি। এজন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “মুসলমানের ওপর তার দাস ও ঘোড়ার মধ্যে কোনো সদাকা নেই।” (বুখারি: ১৪৬৪, মুসলিম: ৯৮২)
তাঁরা বলেন, কোনো জিনিসের প্রকৃতি মূলত যা-ই থাকুক না কেন, জাকাতের ক্ষেত্রে দেখতে হবে বর্তমানে তা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে। এজন্যই পশু যখন হালচাষে ব্যবহার হয়, তখন তাতে জাকাত আসে না। কারণ তখন তা ফসল উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আমরা মনে করি, সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম ও ফকিহদের (মালিকি, শাফিয়ি ও হাম্বলি) মতটাই এ ক্ষেত্রে সঠিক এবং এটাই জাকাতের মূল সুন্নাতের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে মনে রাখতে হবে যে, সোনা-রুপার গয়না যদি সঞ্চয় বা ব্যবসার জন্য রাখা হয় এবং তা সর্বনিম্ন সীমা (নিসাব) পূর্ণ করে তবে সকলের মতেই তাতে বার্ষিক ২.৫% হারে জাকাত দিতে হবে।
মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply