প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে, বিশেষ করে যারা আমেরিকাতে বসবাস করছেন, তাদের মধ্যে নাস্তিকতার প্রভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, মুসলিমরা যখন স্বাধীনভাবে জীবনযাপন শুরু করে এবং জাগতিক সফলতা পায়, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের অহংকার চলে আসে। তারা ভাবতে শুরু করে, “আমি তো সব নিজেই করেছি, এখানে স্রষ্টার কী ভূমিকা?” আবার যখন কঠিন বিপদ বা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তখন আশেপাশের মানুষ বা সমাজ প্রশ্ন তোলে, “কোথায় তোমার খোদা? তিনি কেন তোমাকে সাহায্য করছেন না?” এই ধরনের পরিস্থিতিতে একজন মুসলিম কীভাবে তার ঈমানকে মজবুত রাখবে? বিশেষ করে যখন কষ্ট করে ঈমান গড়ার পরেও মানুষের কথায় মনে সংশয় বা সন্দেহের সৃষ্টি হয়?
উত্তর: বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির শুরুতেই হেদায়েত বা সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। প্রথম মানুষই ছিলেন একজন নবী। কুরআন আমাদের জানায়, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মানুষের মধ্যে কোনো বড় মতভেদ ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলো এবং তারা ধর্মের মধ্যে নিজেদের মনগড়া মতবাদ ও আবেগ মেশাতে শুরু করল।
তখন আল্লাহ সতর্ক করার জন্য নবী-রাসুল পাঠালেন এবং তাঁদের সাথে কিতাব নাজিল করলেন, যাতে মানুষের মতভেদ দূর করা যায়। কিন্তু এর ফলাফল কী হলো? আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, দেখব প্রায় ৫০০০ বছরের ইতিহাসে নবীগণ জাগতিকভাবে খুব বড় কোনো সফলতা পাননি। বরং হাজার হাজার বছর ধরে শিরক সমাজ ও রাষ্ট্রে শিকড় গেড়ে বসেছিল। শিরক কেবল একটি ধারণা ছিল না, এটি একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। রাজাদেরকে মানুষ দেবতার অবতার মনে করত এবং রাজারাও সেই হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতেন।
এর একটি বড় উদাহরণ হলেন হযরত নূহ (আ.)। তিনি দীর্ঘকাল মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, শেষপর্যন্ত তাঁর সাথে মাত্র ততোজন মানুষ ঈমান এনেছিল, যতোজন একটি ছোট নৌকার যাত্রী হতে পারে। এমনকি তাঁর নিজের ছেলে এবং পরিবারের কিছু সদস্যও তাঁর সাথে যোগ দেয়নি। অর্থাৎ, হাজার হাজার বছর ধরে শিরকের রাজত্বই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
তবে দুইজন নবীর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়—হযরত ঈসা (আ.) এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)। এই দুই নবীর অনুসারীরা রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। এর ফলে পৃথিবীতে প্রায় এক হাজার বছর ধর্মের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল।
যখন কোনো সভ্যতার হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকে, তখন সাধারণ মানুষ তাদের মতবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না বা প্রশ্ন তোলে না। বাইবেলের ‘রেভিলেশন’ অধ্যায়ে (যোহনের প্রকাশিত বাক্য) একটি ভবিষ্যদ্বাণী আছে যে, শয়তানকে এক হাজার বছরের জন্য বন্দি করে রাখা হবে। এই সময়কালটি সেই এক হাজার বছরের সাথে মিলে যায়, যখন ধর্মের প্রতাপে শয়তানি শক্তি বা নাস্তিকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।
সপ্তদশ শতাব্দী থেকে এই অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। একে একে মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোর পতন ঘটতে থাকে। ইরানের সাফাভি সাম্রাজ্য, ভারতের মুঘল সাম্রাজ্য এবং সবশেষে তুরস্কের ওসমানি খেলাফতের পতন হয়। একইভাবে ইউরোপে চার্চের বা পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতাও শেষ হয়ে যায়।
এর ফলে সেই ‘এক হাজার বছরের’ সময়কাল শেষ হয়ে যায় এবং মানুষ তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’ লাভ করে। আগে যেমন হাজার বছর ধরে শিরকের যুগ ছিল, তারপর হাজার বছর তাওহিদের বা ধর্মের রাজনৈতিক যুগ ছিল, এখন আমরা প্রবেশ করেছি নাস্তিকতার যুগে। তাই এখন যে চারদিকে স্রষ্টাকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখছেন, এটি এই যুগেরই বৈশিষ্ট্য।
আগে যেহেতু ধর্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক দাপট ছিল, তাই আমাদের মা-বাবা বা সমাজ যা শিখিয়ে দিতেন, আমরা তা-ই মেনে নিতাম। কেউ প্রশ্ন তুলত না। কিন্তু এখন সেই যুগ নেই। এখনকার যুগ হলো যুক্তি ও তর্কের যুগ। এই যুগে আপনি কেবল “আমার বাবা বলেছেন” বা “আমার বংশে সবাই মুসলিম”—এই যুক্তিতে ঈমান টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। এখন ঈমান রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো জ্ঞান অর্জন করা।
উদাহরণস্বরপ, সুস্থ থাকার জন্য সবাইকে ডাক্তার হতে হয় না, কিন্তু স্বাস্থ্য রক্ষার মৌলিক নিয়মগুলো সবাইকে জানতে হয়। ঠিক তেমনি, ঈমান রক্ষার জন্য সবাইকে বড় আলেম বা স্কলার হতে হবে না। কিন্তু ধর্মের মৌলিক জ্ঞান প্রতিটি সাধারণ মুসলিমের অর্জন করতে হবে।
আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এমন এক সময়ে বাস করছে যখন চারপাশ থেকে নাস্তিকতার আক্রমণ আসছে। তারা স্কুল-কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে এবং ইন্টারনেটে প্রতিনিয়ত এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। তাদের মা-বাবারা যে সনাতন পদ্ধতিতে ঈমান এনেছিলেন, তা দিয়ে এই প্রজন্ম আর টিকতে পারবে না। কারণ এখন আর কোনো রাজনৈতিক শক্তি ধর্মকে রক্ষা করছে না, এখন ধর্মকে রক্ষা করতে হবে জ্ঞানের শক্তি দিয়ে।
সুতরাং, এখন আর ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে বসে থাকার সুযোগ নেই। নিজের ঈমান এবং পরবর্তী প্রজন্মের ঈমান বাঁচাতে হলে আমাদেরকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। আগে সভ্যতা দিয়ে ঈমান রক্ষা হতো, এখন যুক্তি ও জ্ঞান দিয়ে ঈমান রক্ষা করতে হবে। এটাই এই যুগের দাবি।
উস্তাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি
অনুবাদ: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply