মুসলিমদের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, ইসলামে নারী নেতৃত্ব সম্পূর্ণ হারাম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মনে করা হয়, ইসলাম বিষয়টি অনুমোদন করে না। নারী নেতৃত্বের বিরোধিতায় সাধারণত সুরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতটি দলিল হিসেবে পেশ করা হয়, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বকারী।
এই আয়াতটিকে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যবহার করা ভুল। আয়াতটি মূলত পারিবারিক কাঠামোর জন্য নাজিল হয়েছে। একটি পরিবার গঠনের জন্য নারী ও পুরুষের সমন্বয় প্রয়োজন এবং সেখানে একজন প্রধান থাকা আবশ্যক। আল্লাহ পুরুষকে সেই দায়িত্ব দিয়েছেন দুটি কারণে: এক. তাদের পারস্পরিক কিছু শ্রেষ্ঠত্ব বা গুণাবলী এবং দুই. পুরুষরা তাদের সম্পদ থেকে পরিবারের জন্য ব্যয় করে। অর্থাৎ, পরিবারের আর্থিক ও সার্বিক ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেওয়ায় পুরুষকে পরিবারের কর্তা করা হয়েছে। এই পারিবারিক বিধানকে রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে টেনে এনে ‘নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবে না’—এমন কথা বলা অযৌক্তিক।
নারী নেতৃত্বের বিপক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হিসেবে সহিহ বুখারির ৪৪২৫ নম্বর হাদিসটি ব্যবহার করা হয়। হাদিসটি হলো—হজরত আবু বাকরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, “সেই জাতি কখনোই সফলকাম হবে না, যারা তাদের শাসনভার একজন নারীর হাতে অর্পণ করেছে।”
এই হাদিসটির একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ঘটনাটি ছিল পারস্য সাম্রাজ্যকে কেন্দ্র করে। পারস্যের সম্রাট খসরু পারভেজ রাসুল (সা.)-এর পাঠানো ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত চিঠি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করেছিলেন এবং মুসলিম দূতদের হত্যা করেছিলেন। এই ধৃষ্টতার কারণে রাসুল (সা.) বদদোয়া করেছিলেন যে, আল্লাহ যেন তাদের রাজত্বকে অনুরূপভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেন।
পরবর্তীকালে খসরু মারা গেলে পারস্যবাসী তার কন্যা বোরানকে সিংহাসনে বসায়। এই সংবাদ যখন মদিনায় পৌঁছায়, তখন রাসুল (সা.) এ মন্তব্যটি করেছিলেন। রাসুল (সা.)-এর এই উক্তিটি ছিল সেই নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে—একটি আল্লাহদ্রোহী, পতনোন্মুখ সাম্রাজ্য, যারা একজন রাসুলের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদের শাসনভার একজন নারীর হাতে অর্পণ করলেই তারা রক্ষা পাবে না; বরং তাদের ধ্বংস অনিবার্য। এ কথা বুঝাতেই রাসুল (সা.) এই মন্তব্যটি করেছিলেন। সবসময়ের জন্য নারীদের রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বকে ‘হারাম’ বা ‘নাজায়েজ’ ঘোষণা করা রাসুল (সা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল না।
কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় করা একটি মন্তব্য থেকে প্রেক্ষাপট না দেখে এভাবে শরিয়তের বিধান গ্রহণ করা সম্পূর্ণ ভুল। কোনো বিষয় শরিয়তের বিধান হতে হলে অবশ্যই তা কুরআনে সরাসরি বিধান হিসেবে বর্ণিত হতে হবে। কুরআন বা হাদিসে এমন কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই যা সরাসরি নারীকে প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট বা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হতে বাধা দেয়। প্রচলিত ধারণাটি মূলত আয়াত ও হাদিসকে সঠিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে সরলীকরণের ফল। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে হলে কুরআনের আয়াত বা হাদিসকে যথাযথ প্রেক্ষাপট ও কারণসহ অনুধাবন করা জরুরি।
মাওলানা উমর ফারুকের লেকচারের আলোকে
লেখক: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply