সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন উসমান ইবনে মাজউন (রা.) স্ত্রীদের থেকে নিজেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন রাসুল (সা.) তাঁকে ডাকলেন এবং বললেন, “হে উসমান, আমাকে বৈরাগ্য (সন্ন্যাস) অবলম্বনের আদেশ দেওয়া হয়নি। তুমি কি আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ?” তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, না।” তখন রাসুল (সা.) বললেন, “আমার সুন্নাহ হলো আমি নামাজ পড়ি এবং ঘুমাইও; রোজা রাখি এবং কখনো রাখি না; আমি বিয়ে করি এবং তালাকও দিই। সুতরাং যে আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার লোক নয়। হে উসমান, তোমার উপর তোমার পরিবারের অধিকার আছে এবং তোমার নিজের শরীরেরও অধিকার আছে।” (সুনানে দারেমি: ২২১৫)
ব্যাখ্যা
উসমান ইবনে মাজউন (রা.) ছিলেন রাসুল (সা.)-এর একজন সম্মানিত সাহাবি। তিনি সেই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে বাইতুল্লাহর চাবি দেওয়া হয়েছিল এবং আজও তা তাদের বংশধরদের কাছেই আছে।
যখন উসমান ইবনে মাজউন (রা.) তাঁর স্ত্রীদের থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন এই খবরটি রাসুল (সা.)-এর কাছে পৌঁছাল। তিনি জানতে পারলেন যে, উসমান (রা.) তার সকল স্ত্রীকে ত্যাগ করে, ঘর-সংসার ছেড়ে শুধু আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তখন রাসুল (সা.) তাকে ডেকে বললেন, হে উসমান, আমাকে বৈরাগ্য (সন্ন্যাস) অবলম্বনের আদেশ দেওয়া হয়নি। আমাকে যে দ্বীন আল্লাহ দিয়েছেন তাতে দুনিয়া-ত্যাগ বা বৈরাগ্যের কোনো স্থান নেই, ইসলাম এই শিক্ষা নিয়ে আসেনি।
আমাদের সুফি আলেমগণ মনে করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিয়ে-শাদি, চাকরি বা অর্থ উপার্জন– এসব নিম্নস্তরের কাজ। মানুষের উচিত এর চেয়ে উচ্চস্তরে যাওয়া, আর সেই উচ্চস্তর হলো দুনিয়া-ত্যাগ করা। তাদের কাছে দুনিয়া হলো মায়াজাল, যা ত্যাগ করা উচিত। সুফিবাদের মূল শিক্ষা এটাই—তারা মানুষকে এই পথের দিকেই নিয়ে যেতে চায় এবং একেই আসল উদ্দেশ্য মনে করে।
এই চিন্তাধারা থেকেই বৈরাগ্যবাদ বা সন্ন্যাসবাদের জন্ম হয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বেও এই ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তারা মনে করেন, কোনো ব্যক্তি ধার্মিকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় তখন, যখন সে একজন সন্ন্যাসী হয়। তাদের মতে, এটাই সর্বোচ্চ স্তর, আর বাকিরা সাধারণ দুনিয়াদার মানুষ, যারা যিশুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে নিজেদের পাপ মোচন করায়।
এই হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, “হে উসমান, আমাকে বৈরাগ্যের আদেশ দেওয়া হয়নি।” অর্থাৎ, এই কাজের অনুমতি আল্লাহ আমাকে দেননি। এরপর তিনি আরও কঠোরভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি আমার পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছো?” এখানে ‘সুন্নাহ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, শব্দটি কোনো পারিভাষিক বা নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। অনেক সময় কিছু শব্দ পারিভাষিক রূপ লাভ করে, তখন মানুষ সব জায়গায় এটিকে সেই অর্থেই ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু ভাষার ব্যবহার এভাবে হয় না। যেমন আরবিতে ‘সালাত’ শব্দটিকে আমরা ফারসি বা উর্দুতে ‘নামাজ’ বলে থাকি। আরবি ভাষায় ‘সালাত’ শব্দটি শুধু নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয় না, এর অনেক অর্থ রয়েছে—যেমন দোয়া করা, আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া, কারও প্রতি মনোযোগী হওয়া, রহমত কামনা করা ইত্যাদি। কিন্তু পরবর্তীতে এই শব্দটিকেই নামাজের জন্য একটি পরিভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ঠিক তেমনই ‘সাওম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা, কিন্তু এটি রোজার জন্য একটি পরিভাষা হয়ে গেছে।
এখানে ‘সুন্নাহ’ শব্দটি ‘পথ’ বা ‘পদ্ধতি’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। রাসুল (সা.) বুঝাতে চেয়েছেন, তুমি কি আমার জীবনযাপনের পদ্ধতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছো? উসমান ইবনে মাজউন বললেন, “না, হে আল্লাহর রাসুল, এমনটি নয়।” তখন রাসুল (সা.) বললেন, “তাহলে শোনো, আমার পথ হলো আমি রাতে নামাজ পড়ি, আবার ঘুমাইও। আমি এমন করি না যে, সারা রাত নামাজেই কাটিয়ে দিই। আমি দিনের বেলায় রোজা রাখি, আবার কখনও রাখি না। আমি বিয়েও করি এবং প্রয়োজনে তালাকও দিই। কারণ এগুলো সবই মানুষের প্রয়োজন। এরপর রাসুল (সা.) বললেন, “সুতরাং যে আমার এই পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার লোক নয়।” এটি একটি কঠোর সতর্কবাণী। এর মানে হলো, যদি তুমি আমার পথে থাকো, তবেই কিয়ামতের দিন আমার পতাকার নিচে থাকবে।
অনেকেই মনে করেন, এই কাজটি একটি ভালো কাজ। কিন্তু দ্বীনের নামে কোনো কাজ করতে হলে আগে দেখতে হবে, রাসুল (সা.) এই কাজের অনুমতি দিয়েছেন কি না? রাসুল (সা.) পরিষ্কারভাবে বলেছেন, “আমার পথেই চলতে হবে, নতুবা আমার সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই।” এই সম্পর্ক কিয়ামতের দিনের সম্পর্ক।
এরপর রাসুল (সা.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, কেন ইসলামে সন্ন্যাসবাদের স্থান নেই। তিনি বলেছেন, “তোমার উপর তোমার পরিবারের অধিকার আছে এবং তোমার নিজের শরীরেরও অধিকার আছে।”
অর্থাৎ মানুষের জীবনে কেবল আল্লাহর হক নয়, বরং বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবেরও হক নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং মানুষ যদি এই সমস্ত অধিকার পূর্ণ ভারসাম্য ও সংযমের সাথে পালন না করে, তবে এর জন্যও আল্লাহর কাছে মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে।
আল্লাহ আমাদের যে জীবনব্যবস্থা দিয়েছেন, তাতে সমস্ত অধিকারের প্রতি ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য। একারণেই রাসুল (সা.) বলেছেন, “এটাই আমার পথ এবং যদি আমার পথে চলো, তবে কিয়ামতের দিন আমার সাথেই উঠবে। ’’
উস্তাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি
অনুবাদ: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply