সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আমরা মুসলিম সমাজের মধ্যে ঘটে যাওয়া কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যা মানব জীবনের পবিত্রতা এবং মর্যাদার সাথে জড়িত। আহনাফ ইবনে কায়েসের একটি হাদিস থেকে আমরা এই আলোচনার সূত্রপাত করব, যা বুখারি শরীফে বর্ণিত হয়েছে।
হাদিসের বর্ণনা:
আহনাফ ইবনে কায়েস বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাইয়ের (হজরত আলী [রা.]) সাহায্য করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। পথে তার সাথে হযরত আবু বাকরাহ (রা.)-এর দেখা হলো। আবু বাকরাহ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছো?” আহনাফ ইবনে কায়েস (রা.) উত্তর দিলেন, “রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাইযকে সাহায্য করতে যাচ্ছি।”
আবু বাকরাহ (রা.) বললেন, “ফিরে যাও।” কারণ আমি রাসুল (সা.)কে বলতে শুনেছি: “যখন দু’জন মুসলমান তাদের তলোয়ার নিয়ে একে অপরের মুখোমুখি হয় এবং উভয়ই একে অপরকে হত্যা করার ইচ্ছা পোষণ করে, তখন তারা উভয়েই জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। অতঃপর যদি তাদের একজন অন্যজনকে হত্যা করে, তবে হত্যাকারী ও নিহত উভয়ই জাহান্নামে যাবে।” এই কথা শুনে আমি (আবু বাকরাহ) জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, হত্যাকারীর বিষয়টি বুঝলাম, কিন্তু নিহত ব্যক্তি কেন জাহান্নামে যাবে?”রাসুল (সা.) উত্তর দিলেন, “কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করতে আগ্রহী ছিল।”
(সহিহ বুখারি: ৬৫৪৩)
সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ
আহনাফ ইবনে কায়েস (রা.)-এর এই বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিনি রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাই হজরত আলী (রা )কে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং এই উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। এটি সেই সময়ের ঘটনা, যখন হজরত আলী (রা ) খলিফা হয়েছিলেন। ওই সময় তাকে অনেকেই খলিফা হিসেবে মেনে নিয়েছিল এবং কিছু মানুষ ছিল যারা তাকে খলিফা হিসেবে মানেনি। এর ফলে একটি সংকট তৈরি হয়েছিল, এমনকি যুদ্ধও হয়েছিল। আহনাফ ইবনে কায়েস (রা.) এই সময়েই হজরত আলী (রা )কে সাহায্য করতে বের হয়েছিলেন এবং পথে তার সাথে হযরত আবু বাকরাহ (রা.)-এর সাক্ষাৎ হয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার উদ্দেশ্য কী?” আহনাফ (রা.) বললেন, “হজরত আলী (রা )কে সাহায্য করতে যাচ্ছি।”
আবু বাকরাহ (রা.) বললেন, “ফিরে যাও। কারণ আমি রাসুল (সা.)কে বলতে শুনেছি যে, যখন দু’জন মুসলমান তাদের তলোয়ার নিয়ে একে অপরের মুখোমুখি হয় এবং উভয়ই একে অপরকে হত্যা করার ইচ্ছা রাখে, তখন তারা উভয়েই জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।” এই হাদিসটি তিনি শুনিয়েছেন এবং বলেছেন যে, আমি রাসুল (সা.)-এর কাছ থেকে শুনেছি যে, এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। অর্থাৎ, যদি দু’জন মুসলমান যুদ্ধ করার জন্য তলোয়ার বের করে, তবে রাসুল (সা.) বলেছেন যে, উভয়ই নিজেদেরকে আজাবের জন্য প্রস্তুত করছে। অতঃপর যখন তাদের একজন অন্যজনকে হত্যা করে, তখন হত্যাকারী ও নিহত উভয়ই জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়।
রাসুল (সা.) একটি নীতি হিসেবে এই কথাটি বলেছিলেন। তিনি এই ঘটনাটি এই পরিস্থিতিতে বর্ণনা করেছেন। এরপর আবু বাকরাহ রাসুল (সা.)কে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল (সা.), হত্যাকারী তো ঠিক আছে, কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী দোষ?” রাসুল (সা.) বললেন, “কারণ সেও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব ছিল।”
হাদিসের শিক্ষা:
এটি অত্যন্ত কঠোর একটি সতর্কবার্তা। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, মুসলমানরা কোনো অবস্থাতেই যেন নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে।মুসলমানদের উচিত আলোচনা ও পারস্পরিক কথাবার্তার মাধ্যমে নিজেদের দ্বন্দ্বের সমাধান করা। কারণ, যখন তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, তখন মানুষ মারা যাবে।
আমাদের সমাজে কিছু লোক দ্বীনের নামে হত্যা ও লুটপাটে লিপ্ত হয় এবং এর জন্য নানা ধরনের ব্যাখ্যা দেয়। এখানে রাসুল (সা.) আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হত্যাকারী ও নিহত, অর্থাৎ, যখন দু’জন মুসলমান একে অপরের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তলোয়ার নিয়ে সামনে আসে, তখন উভয়ই একে অপরকে হত্যা করতে চায়। তখন একজন হত্যা করতে সফল হয় এবং অন্যজন নিহত হয়। সুতরাং, কোনো অবস্থাতেই এই কাজটি করা উচিত নয়।
যখন কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয়, তখন সে তার পদক্ষেপের কারণও ব্যাখ্যা করে। যেমন এই পরিস্থিতিতে যোদ্ধারা বর্ণনা করেছিল অথবা তারা বলেছিল যে, আমরা এই দিক থেকে এই পদক্ষেপের জন্য বৈধতা অনুভব করি।
আবু বাকরাহ (রা.) তাদের বললেন যে, এই বিষয়টি এত সহজ নয়; এর গুরুত্ব বোঝা উচিত। আল্লাহ মানব জীবনকে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন; এটিকে সম্মান প্রদান করা হয়েছে। জীবনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে দশবার ভাবুন। এর শাস্তি হিসেবে বলা হয়েছে, অনন্তকালের জাহান্নাম নির্ধারিত হয়ে যাবে। এটি সেই শাস্তি যা আল্লাহর দ্বীনকে জেনে-বুঝে অস্বীকারকারীদের জন্য কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।
যদি কোনো মুসলমানের জীবন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে প্রথমে নিজের রবের দিকে ফিরে এসে এই প্রশ্ন করা উচিত যে, আমি কী করতে যাচ্ছি? আমার প্রতিপালক বলেছেন যে, তিনি মানবাত্মাকে—অর্থাৎ ঈমান ও কুফর নির্বিশেষে—মানবাত্মাকে এই মর্যাদা দান করেছেন যে, কারো অধিকার নেই সে তার দিকে আঙ্গুল তুলবে। যদি কেউ এমন করে, তবে সে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করে। আর যদি সে এর থেকেও এগিয়ে গিয়ে কোনো মুমিন বান্দার বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেয়, তবে এটি আরও গুরুতর।
কিন্তু এই সতর্কবার্তাটি তিনি (আবু বাকরাহ) একজন ব্যক্তিকে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, এই কাজে যেয়ো না, এটি কোনো সহজ বিষয় নয়। যদি লোকেরা এই মুহূর্তে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর এই সতর্কবার্তাকে সামনে রেখে থেমে যায়, তবে তারা তলোয়ারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে না। তারা চেষ্টা করবে একসাথে বসতে, একে অপরের কথা শুনতে, আলোচনার পদ্ধতি গ্রহণ করতে, কোনো শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ খুঁজতে চেষ্টা করবে।
কিন্তু যদি মুসলমানরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে মুসলমানদের উচিত রাসুল (সা.)-এর এ সতর্কবার্তা মনে রাখা যে, দু’জন ব্যক্তি একে অপরকে হত্যা করার জন্য দাঁড়ালে তারা যেন এটা মনে না করে যে, শুধুমাত্র হত্যাকারীই কিয়ামতের দিন হত্যাকারী হিসেবে বিবেচিত হবে; না, বরং নিহত ব্যক্তিও একই অপরাধীর কাতারে গিয়ে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাকেও একইভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন। এর কারণ হিসেবে রাসুল (সা.) বলেছেন, সেও একই উদ্দেশ্য পোষণ করত যে, সুযোগ পেলে আমি তাকে হত্যা করব। সুতরাং, যখন পরিস্থিতি এমন হয়, তখন স্পষ্টতই উভয়কেই সতর্ক হওয়া উচিত। কুরআনে আমাদেরকে হাবিল ও কাবিলের ঘটনায় বলা হয়েছে, যখন এক ভাই তলোয়ার তুলে নিয়েছিল, তখন অন্য ভাই বলেছিল: “আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য তোমার দিকে হাত বাড়াব না।” আমি চাই না যে, আমার পক্ষ থেকে এমন কোনো ঘটনা ঘটুক।
অতএব মানব জীবনকে পবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে। তাই বিনা কারণে কেউ কাউকে কখনোই হত্যা করতে পারবে না। আর মুসলমানরা তো অবশ্যই একে অপরের বিরুদ্ধে তলোয়ার উঠাতে পারে না। যদি মুসলমানরা এই অপরাধ করে, তাহলে উভয়ই জাহান্নামে যাবে।
উস্তাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি
অনুবাদ: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply