রমজান মাসে দিনের বেলায় খাবারের দোকান বা হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখার জন্য আমাদের দেশসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে এক ধরনের সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। কোথাও কোথাও এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় আইনও থাকতে পারে। এই বিষয়টি কতটুকু ইসলামসম্মত, তা নিয়ে একটি তাত্ত্বিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনটি মূল বিষয় বা যুক্তি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
প্রথমত, নিঃসন্দেহে রোজা আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলমানদের ওপর একটি ফরজ বিধান। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)
তবে এখানে মনে রাখতে হবে যে, রোজা হলো আল্লাহর একটি ইবাদত এবং এটি একান্তই আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যকার একটি বিষয়। একজন মুসলমান তার প্রভুর প্রতি বিনয় ও ভালোবাসা থেকে এই ইবাদত পালন করবে। এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো বিষয় নয়। যদি রোজা ফরজ হওয়া সত্ত্বেও কেউ তা পালন না করে, তবে তাকে উপদেশ দেওয়া যেতে পারে, রোজার গুরুত্ব ও আল্লাহর ইবাদতের মহত্ত্ব তাকে বোঝানো যেতে পারে। কিন্তু এ নিয়ে জবরদস্তি বা চাপ সৃষ্টির কোনো অবকাশ নেই।
দ্বিতীয়ত, যে আয়াতে আল্লাহ রোজাকে ফরজ হিসেবে তুলে ধরেছেন, ঠিক তার পরের আয়াতে আল্লাহ কিছু মানুষের জন্য রমজানে রোজা না রাখার অনুমতি দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন:
“এর মধ্যে আবার যে তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হবে অথবা সফররত থাকবে, সে অন্য দিনগুলোতে এই গণনাটি পূর্ণ করতে পারবে।” (সূরা বাকারা: ১৮৪)
অর্থাৎ, অসুস্থ ব্যক্তি এবং মুসাফিরদের জন্য আল্লাহ ছাড় দিয়েছেন। এছাড়াও একটি দেশে শুধু মুসলমানরাই বাস করে না, সেখানে অন্য ধর্মের অনুসারীরাও থাকে, যাদের ওপর রোজা ফরজ নয়। এখন প্রশ্ন হলো, যদি রমজান মাসে হোটেল-রেস্তোরাঁ বা খাবারের দোকানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে এই অসুস্থ ব্যক্তি, মুসাফির এবং অমুসলিমরা কোথায় খাবেন?
বিশেষ করে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো মূলত মুসাফিরদের জন্যই বেশি প্রয়োজন হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারাই সেখানে খেয়ে থাকেন। তাই মুসাফির, অসুস্থ বা শরিয়তসম্মত ওজরের কারণে যারা রোজা রাখে না, তাদের খাবারের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া বা এ নিয়ে রাষ্ট্রীয় আইন ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা মোটেও ইসলামসম্মত নয়।
তৃতীয়ত, রাসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে আমাদের সময়ের মতো রাস্তাঘাটে বা হাট-বাজারে হোটেল-রেস্তোরাঁ বা খাবারের দোকানের প্রচলন ছিল না। তবে সেই যুগে এমন কোনো নজিরও পাওয়া যায় না যেখানে কাউকে জোরপূর্বক রোজা রাখার জন্য বাধ্য করা হয়েছে, কিংবা কারো ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, অথবা রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন জারি করা হয়েছে যে, দিনের বেলা কেউ খেতে পারবে না।
অতএব বোঝা গেল, সামাজিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে বা রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন করে রোজার মতো একটি ইবাদতকে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। রোজা একটি ইবাদত, যা মুসলমান বান্দা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও বিনয় থেকে পালন করবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে দ্বীন বোঝার তৌফিক দান করুন।
মাওলানা উমর ফারুকের লেকচারের আলোকে
লেখক: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply