শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া সম্পূর্ণরূপে একটি দেশীয় সংস্কৃতি। এটি মূলত ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি প্রতীকী মাধ্যম। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এতে আপত্তির কিছু নেই এবং এটি কোনোভাবেই শিরকের পর্যায়ে পড়ে না।
বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের দুটি বিষয়ে জানতে হবে:
১. শহীদ মিনার কী এবং কেন এটি নির্মাণ করা হয়েছে?
২. শিরক বলতে ইসলামে কী বোঝানো হয়?
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষা বাংলার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করার জন্যই এই স্তম্ভগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, যাকে আমরা ‘শহীদ মিনার’ বলি। প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি এখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং তাদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত মাতৃভাষার প্রতি আমাদের চেতনাকে জাগ্রত রাখা হয়। এখানে ধর্মের কোনো বিষয় জড়িত নেই।
শহীদ মিনারের এই স্তম্ভগুলোর একটি বিশেষ প্রতীকী অর্থ রয়েছে। এর মাঝখানের সবচেয়ে বড় স্তম্ভটি হলো ‘মা’ বা মাতৃভাষার প্রতীক। আর তার দুই পাশে থাকা একটু নিচু বা ছোট স্তম্ভগুলো হলো মায়ের ‘সন্তান’ বা ভাষা শহীদদের প্রতীক, যারা মায়ের ভাষার জন্য আত্মত্যাগ করেছেন। এটি কেবলই একটি রূপক বা প্রতীকী স্থাপত্য, যার মাধ্যমে মায়ের ভাষার প্রতি সন্তানদের ভালোবাসাকে তুলে ধরা হয়েছে।
আসুন এবার দেখি, পবিত্র কুরআনের আলোকে ‘শিরক’ আসলে কী। শিরক হলো মহান আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক বা অংশীদার করা। অর্থাৎ, আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি এবং ক্ষমতা বা এখতিয়ারের সমকক্ষ অন্য কাউকে মনে করাই হলো শিরক। যেমন, কাউকে আল্লাহর সন্তান মনে করা বা আল্লাহর সত্তার সাথে সম্পৃক্ত করা। আরবের মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা মনে করত, আবার খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র বলে বিশ্বাস করে—এগুলো শিরক।
একইভাবে, যেসব ক্ষমতা কেবল আল্লাহর রয়েছে, সেই একই ক্ষমতা অন্য কারও আছে বলে বিশ্বাস করা বা আল্লাহর সমকক্ষ ভেবে কারও কাছে এমন কিছু চাওয়া, যা কেবল আল্লাহ দিতে পারেন—এসবই শিরক। যারা মূর্তি পূজা করেন, তারা এভাবেই নিজেদের তৈরি করা মূর্তিকে বিভিন্ন ক্ষমতার অধিকারী দেবতার প্রতীক মনে করে তাদের কাছে প্রার্থনা বা পূজা করে থাকেন।
শহীদ মিনারের বিষয়টির সাথে শিরকের এই সংজ্ঞার তুলনা করলে দেখা যায়, এখানে শিরকের ন্যূনতম কোনো উপাদান নেই। শহীদ মিনারে যারা ফুল দেন, তারা কেউই শহীদদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ কোনো দেবতা মনে করেন না। শহীদদের কোনো অলৌকিক ক্ষমতা আছে বলেও কেউ বিশ্বাস করেন না বা তাদের কাছে কিছু প্রার্থনাও করেন না। অর্থাৎ, এখানে শহীদদের কোনো পূজা করা হয় না।
শহীদ মিনার কেবলই একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এখানে ফুল দেওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের স্মরণ করা, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানানো এবং মাতৃভাষার প্রতি নিজেদের চেতনাকে শানিত করা। যেহেতু এখানে আল্লাহর সত্তা বা ক্ষমতার সাথে কাউকে শরিক করার কোনো বিষয় নেই, তাই শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে শিরক বলার কোনো যৌক্তিক বা ইসলামি ভিত্তি নেই।
মাওলানা উমর ফারুকের লেকচারের আলোকে
লেখক: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply