একজন নবী বিপ্লবী নাকি সংস্কারক?

admin Avatar

একজন নবী কী হিসেবে পৃথিবীতে আসেন? তিনি কি একজন বিপ্লবী, যিনি এসেই বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা ভেঙে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কাজ করেন? নাকি তিনি একজন সংস্কারক, যিনি মানুষকে ভেতর থেকে বদলাতে চেষ্টা করেন? চলুন, এই প্রশ্নের উত্তরটি আমরা সরাসরি কুরআন থেকে জানার চেষ্টা করি।

আল্লাহ পৃথিবীতে নবীদের কেন পাঠিয়েছেন, তা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে খুব স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। যেমন, সূরা আনআমের ৪৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “নবী-রাসুলদেরকে আমি শুধু এজন্যই প্রেরণ করি যাতে তাঁরা (মানুষের জন্য) সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হন। তাই যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদেরকে সংশোধন করেছে তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”

অর্থাৎ, নবীদের মূল কাজ হলো মানুষকে পরকালের ব্যাপারে সচেতন করা। যারা নবীদের এই বার্তা শুনে ইমান আনে এবং নিজেদের সংশোধন করে নেয়, পরকালে তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।

এখন প্রশ্ন হলো, নবীরা কীসের সুসংবাদ দেন আর কীসের ব্যাপারে সতর্ক করেন? এর উত্তরও কুরআনে আছে। সূরা আনআমের ১৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, নবীরা মানুষদেরকে কিয়ামতের দিন বা পরকালের ব্যাপারে সতর্ক করতেন।

একজন মানুষ কীভাবে জান্নাতে যেতে পারে এবং কীভাবে নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে পারে, নবীরা সেই পথ দেখাতে আসেন। জান্নাতে যাওয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলা এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য পাপ কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা, এটাই হলো নবীদের শিক্ষার মূল বিষয়।

নবী (সা.)-এর আগমনের উদ্দেশ্য সূরা জুমুআর ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়েছে: “তিনিই সেই সত্তা, যিনি নিরক্ষরদের মাঝে তাদেরই মধ্যে থেকে একজন রাসুলের আবির্ভাব ঘটিয়েছেন, যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনান, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং এর জন্য তাদেরকে বিধান ও হিকমাহ শিক্ষা দেন। বস্তুত এর আগে তারা ছিল সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত।”

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নবীর প্রধান কাজ হলো মানুষকে পবিত্র করা, মানুষের চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা এবং চরিত্রকে সুন্দর ও পরিশুদ্ধ করে তোলা। মানুষের মনের ভেতর যে খারাপ দিকগুলো বা কলুষতা থাকে, তা দূর করে তাকে একজন খাঁটি মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই নবীর দায়িত্ব।

অনেকে মনে করেন নবীগণ হয়তো এসেই রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের জন্য আন্দোলন করেন। কিন্তু বিষয়টি আসলে তেমন নয়। নবীদের আসল কাজ হলো মানুষকে চারিত্রিক ও নৈতিক দিক থেকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে তোলা।

যখন একজন মানুষ নবীর শিক্ষা মেনে নিজেকে ভেতর থেকে পবিত্র করে ফেলে, খারাপ কাজ ছেড়ে দেয় এবং নিজেকে জান্নাতের যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলে, তখন এর প্রভাব সমাজে পড়তে বাধ্য। যখন অনেকগুলো মানুষ এভাবে ব্যক্তিগতভাবে ভালো হয়ে যায়, তখন পুরো সমাজব্যবস্থাতেই একটা বিশাল পরিবর্তন বা বিপ্লব চলে আসে।

অর্থাৎ, সমাজ পরিবর্তন বা বিপ্লব নবীদের কাজের ‘ফলাফল’ হতে পারে, কিন্তু তাঁদের মূল কাজ হলো মানুষকে পরকালমুখী করা এবং তাদের চরিত্রকে পবিত্র করা। তাঁরা মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলেন যেন তারা দুনিয়ার লোভ-লালসা ও পাপ থেকে বেঁচে পরকালের শান্তির পথে চলতে পারে।

নবীগণ পৃথিবীতে এসেছিলেন মানুষকে পথ দেখাতে। তাঁরা মানুষকে শেখান কীভাবে নিজেকে কলুষমুক্ত রাখতে হয় এবং কীভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে পরকালে জান্নাত লাভ করা যায়। এই আত্মশুদ্ধি বা নিজেকে সংশোধন করার মাধ্যমেই সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরে আসে।

মাওলানা উমর ফারুকের লেকচারের আলোকে

লেখক: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *