ভোট একটি আমানত— এ কথার অর্থ কী?

admin Avatar

আমরা জানি, ভোট একটি আমানত। কিন্তু এ কথার অর্থ আসলে কী? ভোট কীভাবে আমানত? এই আমানত কে আমাদের হাতে রেখেছেন? ভোটের মর্ম কী এবং আমানত কাকে বলে? আজকে আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার চেষ্টা করব।

গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে ভোট

ভোট আধুনিক গণতন্ত্রের একটি উপাদান। তাই গণতন্ত্রে ভোটকে কীভাবে দেখা হয়, সেটাই আমরা আগে দেখব। গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার আসল মালিক জনগণ। সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তারা তাদের সেই ক্ষমতা নির্দিষ্ট কিছু লোকের হাতে অর্পণ করে, যারা তাদের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত এবং তাদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য। জনগণ চাইলে যেকোনো সময়ে তাদের কাছ থেকে সেই ক্ষমতা হরণ করতে পারে। জনগণের এই ক্ষমতা অর্পণের মাধ্যম হলো ভোট।

ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট

কুরআন যখন নাজিল হয়, তখন ভোটের এই প্রচলিত পদ্ধতি ছিল না। কিন্তু মুসলমানদের সরকার বা অন্য যেকোনো সম্মিলিত ব্যবস্থা গঠন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে কুরআন একটি মৌলিক নির্দেশনা দিয়েছে। সুরা শুরার ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:

“তাদের সম্মিলিত ব্যবস্থা পরস্পরের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল।”

কুরআনের এই নির্দেশনা থেকে প্রতীয়মান যে, সম্মিলিত ব্যবস্থার সকল এখতিয়ার জনগণের হাতে। তাদের পরামর্শের ভিত্তিতেই যেকোনো সম্মিলিত ব্যবস্থা বা সরকার গঠিত, পরিচালিত এবং বিলুপ্ত হবে। কুরআনের দেওয়া এই মূলনীতির আলোকেই ইসলামের প্রথম যুগের খলিফাগণ নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং এই মূলনীতির আলোকেই তাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন।

আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশো বছর আগে কুরআন সরকার গঠন ও পরিচালনার এই মূলনীতি দিয়েছে। কুরআনের এই মূলনীতির সাথে আধুনিক গণতন্ত্রের অনেকটাই মিল রয়েছে। এই মূলনীতির আলোকে আধুনিক গণতন্ত্রের ভোট হলো কুরআনের দৃষ্টিতে জনগণের পরামর্শ বা মতামত, যার ওপর ভিত্তি করে তাদের সম্মিলিত ব্যবস্থা বা সরকার গঠিত ও পরিচালিত হয়।

এখন আমরা দেখব, আমানত কাকে বলে?

আমানত আরবি ভাষার একটি শব্দ। কারো প্রতি আস্থা রেখে তার হাতে যা রাখা হয়, সেটাকে আরবি ভাষায় আমানত বলা হয়; তা হতে পারে কোনো বস্তু, তথ্য, দায়িত্ব, কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা।

এখন প্রশ্ন আসে যে, ভোট কীভাবে আমানত আর এই আমানত কে আমাদের হাতে রেখেছেন?

গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে ভোট আমার নিজের ক্ষমতা আমার প্রতিনিধির হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যম। আমার এই ক্ষমতা কেউ আমার হাতে আমানত রেখেছে, গণতন্ত্র এ কথা বলবে না। কারণ গণতন্ত্র শুধু দুনিয়ার দিকটা দেখে।

কিন্তু ইসলাম যেহেতু স্রষ্টার সাথে মানুষের সম্পর্কের দিকটি পরিষ্কার করে, তাই ইসলাম এ ক্ষেত্রে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। ইসলাম বলেছে, মানুষের এই স্বাধীন ইচ্ছা ও ক্ষমতা তার নিজের নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে আমানত হিসেবে। দুনিয়ার জীবনে মানুষের এই স্বাধীন ইচ্ছা ও ক্ষমতার বিষয়টি বুঝাতে আল্লাহ সরাসরি ‘আমানত’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। সুরা আহজাবের ৭২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন:

“আমি এই আমানত (স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও ক্ষমতা) আসমান, জমিন ও পাহাড়-পর্বতের কাছে পেশ করেছিলাম, তখন তারা তা বহন করতে অস্বীকার করেছিল এবং এ বিষয়ে ভয় পেয়েছিল। কিন্তু মানুষ তা বহন করে নিল। বস্তুত সে অত্যন্ত দুঃসাহসী ও আবেগপ্রবণ।”

কুরআনের এ আয়াত থেকে প্রতীয়মান যে, মানুষের এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও ক্ষমতা তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে দেওয়া হয়েছে। আর ভোটের মাধ্যমে মানুষ যেহেতু তার এই ক্ষমতার ভিত্তিতে কিছু লোককে তার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়, তাই ভোটও সেই আমানতের একটি অংশ। অতএব আল্লাহর এই আমানতের দাবি হলো, ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ বা লাভের দিকে না তাকিয়ে সামগ্রিকভাবে সবার জন্য তুলনামূলকভাবে যাকে আপনি অধিক কল্যাণকর মনে করেন, তাকেই ভোট দেওয়া।

তবে এখানে মনে রাখতে হবে যে, প্রত্যেক মানুষকেই আল্লাহ বিবেচনাবোধ দিয়েছেন। সেই বিবেচনাবোধের আলোকেই সে তার সিদ্ধান্ত নিবে। অন্যকেউ নিজের সিদ্ধান্ত তার ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না।

শুধু ভোট কেন, জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে মানুষের উচিত হলো আল্লাহর এই আমানত রক্ষা করা এবং নিজের স্বাধীন ক্ষমতাকে আল্লাহর পছন্দ অনুযায়ী ব্যবহার করা।

মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *