আমি দোয়া করি, আল্লাহ আপনাদের জ্ঞানে বরকত দান করুন, আমার দোয়া আপনাদের সাথে আছে। জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী একজন শিক্ষার্থীর প্রতি আমি মোট পাঁচটি নসিহত করব।
১. সর্বাবস্থায় নিজেকে ছাত্র মনে করুন। আপনি সাধারণ মানুষ হন কিংবা জ্ঞানী, সর্বাবস্থায় নিজেকে একজন ছাত্র মনে করবেন। যেই মুহূর্তে একজন মানুষের মনে এই অহংকার তৈরি হবে যে, আমি আলেম বা জ্ঞানী হয়ে গেছি; এমনকি সাধারণ মানুষের মনেও যদি এই অহংকার তৈরি হয়, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার জন্য জ্ঞানের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। একজন সত্যিকারের জ্ঞানপিপাসু ছাত্র তাকেই বলে, যে নিজেকে সবজান্তা মনে করে না, বরং জ্ঞান অর্জনে সর্বদা প্রস্তুত থাকে।
২. ভিন্নমতকে স্বাগত জানানোর মনোভাব নিজের মধ্যে তৈরি করুন। জ্ঞান অর্জনের অর্থ হলো ভিন্নমতকে স্বাগত জানানো। যেই জ্ঞান আপনার মতের সাথে মিলে যায়, সেটা মেনে নেওয়া তো খুব সহজ, অনেকটা পকেটে টাকা রাখার মতো। কিন্তু ভিন্নমতকে স্বাগত জানানো আর সেটা মেনে নেওয়া—দুটো আলাদা জিনিস। স্বাগত জানানোর অর্থ হলো, কেউ যখন আপনার সমালোচনা করবে বা আপনার সাথে ভিন্নমত পোষণ করবে, তখন খুশি মনে সেই ভিন্নমত শোনার জন্য আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। সর্বদা মনে করতে হবে যে, হয়তো নতুন কোনো সত্য উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
আমার শিক্ষক ইমাম আমিন আহসান ইসলাহি একটি চমৎকার কথা বলতেন। তিনি বলতেন, যেদিন তিনি কুরআন খুলে কোনো কঠিন আয়াত পড়তেন, সেদিন তিনি বলতেন—‘আজকের দিনটি সার্থক।’ অর্থাৎ, আজ নতুন কোনো রহস্য উন্মোচিত হবে, আজ নতুন কোনো সত্য জানা যাবে। অথচ আমরা কঠিন কিছু দেখলে বা ভিন্নমত দেখলে ভয় পাই বা রেগে যাই। মুসলমান আজ ভিন্নমতকে স্বাগত জানানোর গুণটি হারিয়ে ফেলেছে। ফলে তারা জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ধর্মীয় হোক বা সেক্যুলার, সবার সাথেই ভদ্রতার সাথে কথা বলা উচিত। ভিন্নমত শুনে রেগে যাওয়া মানে হলো আপনি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হারালেন।
৩. সমালোচনার সঠিক মূল্যায়ন করুন। সমালোচনাকে ভয় পাবেন না। আমি আমার ছাত্রদের সবসময় বলি, কেউ সমালোচনা করলে আমি দেখি না সে কে বা সে আমার বই পড়েছে কি না। আমি দেখি সমালোচনাটা কী। যদি আপনার নিজের ভেতর আত্মসমালোচনা থাকে, তবে বাইরের সমালোচনা আপনাকে কষ্ট দেবে না।
সমালোচনাকে শিক্ষার একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করুন। যখন কেউ আপনার সমালোচনা করবে, তখন দুটি বিষয় ঘটতে পারে:
হয় তার কথাটি সত্য। সেক্ষেত্রে আপনি নিজের ভুল শুধরে নিতে পারলেন, অর্থাৎ আপনি লাভবান হলেন।
অথবা তার কথাটি ভুল এবং আপনার কথাটিই সঠিক। এতে আপনার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যাবে।
উভয় ক্ষেত্রেই আপনার লাভ। তাই সমালোচকের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, তার হাত চুম্বন করা উচিত, কারণ তিনি আপনার জন্য নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দিয়েছে। আমাদের মাদ্রাসায় ছাত্রদের বিতর্ক শেখানো হয়। কিন্তু সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ শেখানো হয় না। অন্যের মতকে তার চেয়েও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা, তারপর সেটার বিচার করা, এসব বিষয় শিক্ষা দেওয়া উচিত ছিল। অন্যের কথা মন দিয়ে শুনুন, বুঝুন এবং তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
৪. সত্যের প্রতি আপসহীন থাকুন। আমরা সব সময় নিজ দলের কথা বিনা প্রশ্নে মেনে নিই। কিন্তু সত্য বিষয় মেনে নিতে আমরা আগ্রহী থাকি না। আমাদের উচিত ছিল, যদি আমি দেখি সত্য আমার বিপক্ষে, তবুও আমি সত্যের পক্ষেই থাকব। সত্যের খাতিরে যদি একাও দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তবুও দাঁড়াব। কুরআনে বলা হয়েছে, ন্যায়বিচারের পক্ষে সাক্ষী হও, এমনকি সেটা যদি তোমার নিজের বা বাবা-মায়ের বিরুদ্ধেও যায়। সত্য এতটাই প্রিয় হতে হবে যে, মানুষ মানুক বা না মানুক, মারুক বা কাটুক—আপনি সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন না।
৫. জ্ঞানের ভাষায় কথা বলুন। মানুষের সাথে কথা বলার সময় আবেগের ভাষা নয়, বরং জ্ঞানের ভাষা ব্যবহার করুন। আবেগ মানুষকে শেষ করে দেয়, কিন্তু জ্ঞান মানুষের মধ্যে ধৈর্য তৈরি করে। আবেগ দিয়ে বেশিক্ষণ টেকা যায় না, আবেগের আগুন জ্বলে আবার নিভে যায়। কিন্তু জ্ঞানের ভাষা মানুষকে শান্ত ও স্থির রাখে। আপনি সিদ্ধান্ত নিন যে, আপনি সবসময় যুক্তি ও জ্ঞানের ভাষায় কথা বলবেন। যখনই মানুষ জ্ঞানের ভাষায় কথা বলা শুরু করে, তখন সে বুঝতে পারে, অহেতুক আবেগের কোনো মূল্য নেই।
এগুলোই আপনাদের প্রতি আমার নসিহত। যদি ভালো লাগে তবে গ্রহণ করবেন, আর যদি ভালো না লাগে তবে খামে ভরে আমেরিকায় ফেরত পাঠিয়ে দেবেন (এ কথাটি কৌতুক হিসেবে বলা)।
উস্তাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি
অনুবাদ: আল মানার ইনস্টিটিউট

Leave a Reply