ইসলামি রাজনীতি, ইসলামি রাষ্ট্র, ইসলামি সরকার, ইসলামপন্থা— এই শব্দগুলোর সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এই শব্দ বা কনসেপ্টগুলো আগের তুলনায় আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে এখন ইসলামপন্থীদের উত্থান অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রশ্নগুলো হলো:
ইসলামের সাথে রাজনীতির কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে?
ইসলাম কি আলাদা কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা দিয়েছে? আর সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা বা বাস্তবায়ন করা কি সকল মুসলমানের জন্য ফরজ?
অথবা ইসলামের প্রধান ও চূড়ান্ত লক্ষ্য কি সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা? অন্যকথায় এটি কি ইসলামের সবচেয়ে বড় ফরজ?
ইসলামপন্থীরা এই প্রশ্নগুলোর হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেন এবং এই লক্ষ্যেই তারা তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এর পক্ষে তারা কুরআন-হাদিস থেকে বিভিন্ন প্রমাণও উপস্থাপন করেন।
অন্যদিকে আমাদের দেশের প্রচলিত ধারার রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান, অথবা তারা একবাক্যে বলে দেন, ধর্মের নামে রাজনীতি চলবে না, রাজনীতির সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই ইত্যাদি। আর না হয় তারা ইসলামপন্থার বিপরীতে সেক্যুলারিজম নিয়ে হাজির হন।
কিন্তু বিষয়টির সুরাহা তো এভাবে হবে না। একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে হোক বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশের রাজনীতিবিদ হিসেবে হোক, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে। আর যেহেতু এই প্রশ্নগুলো ধর্মের সাথে সম্পর্কিত, তাই এগুলোর উত্তর অবশ্যই ধর্মীয় উৎসগ্রন্থে খুঁজতে হবে। ইসলামপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি কুরআন-হাদিসের আলোকেই খতিয়ে দেখতে হবে।
ইসলামের একজন ক্ষুদ্র শিক্ষার্থী হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে, কুরআন-হাদিসের আলোকে ইসলামপন্থীদের এই দৃষ্টিভঙ্গি সব ক্ষেত্রে পুরোপুরি যথার্থ নয়। রাজনীতির সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই তা যেমন সঠিক নয়, একইভাবে ইসলামপন্থীদের বয়ানও সঠিক নয়। তাই, ইসলামপন্থীদের বয়ানের বিপরীতে কুরআন-হাদিসের আলোকে একটি প্রতিউত্তরমূলক বয়ান সামনে নিয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়েছে। আজকের এই লেখায় আমি শুধু কিছু মৌলিক পয়েন্ট তুলে ধরব। প্রত্যেকটি পয়েন্ট নিয়ে দলিল-প্রমাণসহ বিস্তারিত আলোচনা আলাদাভাবে করা যাবে।
১. ইসলামের বিষয়বস্তু শুধুই মানুষের নৈতিক ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধি। আর ইসলামের লক্ষ্য হলো পরকালে মুক্তি ও সফলতা। ইসলাম তার সমস্ত নির্দেশনা ও বিধান এই বিষয়বস্তু ও লক্ষ্যের ভিত্তিতে দিয়েছে। মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে যেখানেই নৈতিক ও চরিত্রগত দিক থেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া দরকার, সেখানেই ইসলাম নির্দেশনা দিয়েছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনীতির ক্ষেত্রেও ইসলামের নির্দেশনা ও বিধান এই প্রকৃতির। ইসলাম নিজের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেয়নি, বরং নৈতিকতা বা মানুষের অধিকার রক্ষার ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য কিছু মৌলিক নির্দেশনা ও বিধান দিয়েছে।
২. প্রত্যেকের অবস্থান অনুযায়ী ইসলাম তার নির্দেশনা দেয়। আপনি সম্পদশালী হলে আপনার ওপর জাকাত ফরজ হবে, হজ্ব ফরজ হবে, দরিদ্র হলে নয়। একইভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকবেন, ইসলামের রাষ্ট্রীয় বিধানগুলো পালন করার দায়িত্ব মূলত তাদের। তারা তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে অন্যদের উচিত নিজেদের অবস্থান থেকে তাদেরকে সতর্ক করা। গণতান্ত্রিক দেশে যেহেতু জনগণ তাদের স্বাধীন ইচ্ছায় নেতা নির্বাচন করে এবং জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো সরকারের দায়িত্ব হয়ে থাকে, তাই এ ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাও জরুরি। লেখালেখি, আলোচনা ও বক্তব্যের মাধ্যমে এবং প্রয়োজনে সামাজিক সংগঠন করে সমাজের মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ইসলামের প্রকৃত বার্তা পৌঁছাতে হবে। এভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাজের মানুষ যখন ইসলামের বিধানগুলো অন্তর থেকে গ্রহণ করবে, তখনই প্রকৃত অর্থে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম আসবে। কিন্তু তা না করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক দল গঠন করে অথবা অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করা ইসলামের কোনো নির্দেশ নয় এবং এতে প্রকৃত অর্থে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম আসেও না।
৩. রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের অধিকার রক্ষা করা এবং জনগণের মধ্যে ন্যায়, ইনসাফ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটি মানুষ মূলত এই উদ্দেশ্যেই গড়েছে। আর ইসলামও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদেরকে প্রধানত এই নির্দেশ দেয়। ন্যায় ও ইনসাফ একটি সর্বজনীন ও সর্বজনস্বীকৃত মূল্যবোধ। এর পরিসরও অনেক বড়। বহু ক্ষেত্রেই মানুষের জ্ঞান ও সর্বজনীন বিচারবোধ ন্যায়-নীতির মানদণ্ড নির্ধারণ করে, আর তাই ইসলামও এসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো বিধান দেয়নি। যেসব ক্ষেত্রে মানুষ ভুল করতে পারে, কেবল সেসব ক্ষেত্রেই ইসলাম বিধান দিয়েছে। আর ইসলামের এই বিধানগুলো অবশ্যই ন্যায়ভিত্তিক।
৪. ইসলাম তার রাষ্ট্রীয় বিধানগুলো শুধু মুসলমানদের জন্য দিয়েছে। তাই, রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকদের সম্মতি ছাড়া এই বিধানগুলো তাদের ওপর প্রয়োগ করা যাবে না।
৫. মানুষের অধিকারের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় ছাড়া ধর্মীয় কোনো বিধান রাষ্ট্র মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। আল্লাহ বলেছেন, “ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা বাকারা: ২৫৬)
৬. ইসলাম বলে, সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনা হবে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে। আল্লাহ বলেছেন, “তাদেরি সম্মিলিত ব্যবস্থা পরস্পরের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল।” (সূরা শুরা: ৩৮)
৭. দ্বীনের বিজয় সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলো আরব দেশ এবং রাসুল (সা.) ও তাঁর সাথীদের জন্য নির্দিষ্ট। এগুলোকে ব্যাপক করার সুযোগ নেই। কুরআনের বক্তব্য থেকেই এটা প্রমাণিত।
মাওলানা উমর ফারুক

Leave a Reply