ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্র বিনির্মাণের ১২ দফা ইশতেহার

admin Avatar

১. প্রথমত আমাদের ভালোভাবে স্মরণ রাখতে হবে যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরজ নয়। যদিও মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরজ । কিন্তু তাদের ধারণা সঠিক নয়। কেননা পবিত্র কুরআনে আমরা সরাসরি এমন কোনো নির্দেশনা পাই না যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরজ । এছাড়াও একটি রাষ্ট্রের নামের আগে অথবা পরে ইসলামি শব্দটা যুক্ত করাও বাধ্যতামূলক নয়।

২. ইসলামের দৃষ্টিতে বল প্রয়োগ করে ক্ষমতায় আসা যাবে না। পবিত্র কুরআনে হুকুম দেওয়া হয়েছে, মুসলমানদের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালিত হবে তাদের পারস্পারিক পরামর্শের ভিত্তিতে।

আল্লাহ বলেছেন,

তাদের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল। (সূরা শুরা: ৩৮)

অর্থাৎ একটি মুসলিম রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ। জনগণের পরামর্শের ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হবে। এই পরামর্শ গণতন্ত্র বা ভোটের মাধ্যমেও হতে পারে। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা এবং সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা, কোনোটাই ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। রাসুল (সা.) মদিনার জনগণকে কখনোই বলেননি যে, তিনি তাদের ভূমিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। বরং মদিনার লোকেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাসুল (সা.)-কে তাদের শাসক হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল।

৩. ইসলামের দৃষ্টিতে একটি রাষ্ট্রের প্রধান ও প্রথম কর্তব্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

আল্লাহ বলেছেন,

(হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ তোমাদেরকে এক বিশাল রাজত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; এরই পরিপ্রেক্ষিতে) আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, যাতে তোমরা হকদারদেরকে তাদের আমানত সমজিয়ে দাও এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে তখন যেন ইনসাফের সাথে ফয়সালা করো। আল্লাহ তোমাদেরকে খুবই উত্তম উপদেশ দিচ্ছেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন। (সূরা নিসা: ৫৮)

ইসলামের দৃষ্টিতে শারিয়াহ প্রয়োগ করাই রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

৪. একটি রাষ্ট্র কখনোই জনগণের ছোটখাটো ভুলগুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না। রাসুল (সা.)-এর জীবনী থেকে আমরা জানতে পারি, তিনি কখনোই ছোটখাটো ভুলের জন্য মানুষকে শাস্তি দিতেন না। তিনি কখনোই তার সাহাবিদের রাষ্ট্রের প্রতিটি অলিতে-গলিতে ঘুরে অপরাধী বের করার নির্দেশ দেননি।

রাসুল (সা.) সেই অপরাধের শাস্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করেছেন, যে অপরাধ সমাজে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে এবং অধিক মাত্রায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন, সম্পদ এবং সম্মান রক্ষা করাই রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য। এছাড়া রাষ্ট্র গান শোনার জন্য, দাড়ি না রাখার জন্য, পর্দা বা হিজাব না করার জন্য, সিনেমা হল বা বিউটি পার্লারে যাবার জন্য কখনোই নাগরিকদের উপর বিধিনিষেধ আরেপ করবে না অথবা শাস্তি দিতে পারবে না।

৫. কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে হুকুম দেওয়া হয়েছে যে, ধর্মের ব্যাপারে (আল্লাহর তরফ থেকে) কোনো জবরদস্তি নেই। (সূরা বাকারা: ২৫৬)

ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয় যে, মানুষ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। আর এই আত্মসমর্পণ মানুষ তার নিজ ইচ্ছায় করবে, জোর করে নয়। অতএব জোর করে কাউকে ধর্মান্তরিত করা অথবা ধর্ম পালন করতে বাধ্য করা, কোনোটাই ইসলাম সমর্থন করে না।

উল্লেখ্য যে, রাসুল (সা.) তার জীবদ্দশায় যে যুদ্ধগুলো করেছেন, তা আল্লাহর একটি বিশেষ বিধানের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনে এটিকে আল্লাহর সুন্নাহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পারিভাষিকভাবে এটিকে ইতমাম আল হুজ্জাত বলা হয়। অর্থাৎ যখন পৃথিবীতে কোনো রাসুল আগমন করেন, তখন তিনি তার জাতির ওপর আল্লাহর আদালত প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে তার জাতির মধ্যে যারা তাকে বিশ্বাস করে তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয় এবং যারা তাকে অবিশ্বাস করে তাদেরকে পৃথিবীতেই শাস্তি দেওয়া হয়।

আল্লাহ বলেছেন,

(হে ঈমানদারগণ), তোমরা কি এখনও ওই লোকদের সাথে যুদ্ধ করবে না যারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ফেলেছে এবং (ইতঃপূর্বে) তারাই রাসুলকে (তাঁর শহর থেকে) বহিষ্কার করার দুঃসাহসও দেখিয়েছিল, যেখানে তারা তোমাদের সাথে আগে যুদ্ধ শুরু করেছে? তোমরা কি তাদেরকে ভয় করো? যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও তাহলে এ ক্ষেত্রে আল্লাহই অধিক হকদার যে, তোমরা তাঁকে ভয় করবে। তাদের সাথে যুদ্ধ করো; আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের হাতে শাস্তি দিবেন, তাদেরকে অপমানিত করবেন, তোমাদেরকে সাহায্য করে তাদের উপর বিজয়ী করবেন, (এর মাধ্যমে) মুমিনদের একটি দলের অন্তরকে প্রশান্ত করবেন। (সূরা তওবা: ১৩-১৪)

পবিত্র কুরআনে আল্লাহর এই বিশেষ বিধানের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যেমন হযরত নূহ (আ.)-এর জাতির মধ্যে যারা তাঁকে অস্বীকার করেছিল আল্লাহ তাদেরকে আজাব দিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। তেমনিভাবে আদ, সামুদ ইত্যাদি জাতির সাথেও একই ঘটনা ঘটেছে। সাহাবিগণের হাত দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অস্বীকারকারীদের উপর আল্লাহ এই শাস্তিটাই প্রয়োগ করেছিলেন। এটি রাসুলকে পাঠানোর পর সরাসরি আল্লাহর শাস্তি। তাই পরবর্তী যুগে এটি আর কেউ প্রয়োগ করতে পারবে না্। 

৬. অমুসলিম এবং কাফির এক নয়, অমুসলিম তাকেই বলা হয় যিনি ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করেন না। কিন্তু কাফির হলো সেই ব্যক্তি, যে জেনে-বুঝে সত্য অস্বীকার করেছে। রাসুলদের আগমনের পর একটা পর্যায়ে গিয়ে যারা জেনে-বুঝে সত্য অস্বীকার করেছে, তাদেরকে চিহ্নিত কর্ হয়। কিন্তু বর্তমানে যেহেতু কোনো রাসুল আগমন করবেন না এবং আমরা এটা জানতেও পারব না যে, কে জেনে-বুঝে ইসলামকে অস্বীকার করেছে; তাই কাউকে কাফির বলার অধিকার বর্তমানে আমাদের নেই।

৭. একটি ইসলামি রাষ্ট্র কখনোই শিয়া অথবা সুন্নির মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে পারবে না। কেননা কুরআন অনুযায়ী মুসলমান হিসেবে গণ্য হওয়ার মানদণ্ড হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-কে স্বীকার করা, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং জাকাত প্রদান করা।

আল্লাহ বলেছেন,

অতএব যদি তারা তওবা করে, নামাজের যত্ন নেয় এবং জাকাত প্রদান করে তবে তারা দ্বীনের ক্ষেত্রে তোমাদের ভাই। আমি আমার আয়াতগুলো এমন লোকদের জন্য সবিস্তারে বর্ণনা করছি যারা জানতে চায়। (সূরা তাওবা:১১)।

শিয়াহ ও সুন্নি উভয় সম্প্রদায়ই এগুলো পালন করছে। সুতরাং উভয়েই মুসলিম।

৮. মানুষের জীবন সর্বশক্তিমান আল্লাহর দেওয়া মূল্যবান নেয়ামত। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া আমরা পশু-পাখিকেও হত্যা করতে পারি না। কুরআনের হুকুম অনুযায়ী একজন মানুষকে কেবল দুটি কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।

১. যদি কেউ বিনা অপরাধে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করে।

২. কেউ যদি পরিকল্পিতভাবে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

আল্লাহ বলেছেন,

(মানুষের) এ (অবাধ্যতার) কারণেই আমি (মূসাকে যখন শরিয়ত দিয়েছিলাম তখন তাতে) বনী ইসরাইলের প্রতি আমার এই নির্দেশনা লিখে দিয়েছিলাম যে, কোনো মানুষকে হত্যা অথবা দুনিয়ায় কোনো ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম না করা সত্ত্বেও যে কোনো মানুষকে হত্যা করল সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করল। অপরদিকে যে কোনো মানুষের জীবন বাঁচাল সে যেন সকল মানুষের জীবন বাঁচাল। (শুধু তাই না, সেইসাথে) এও এক বাস্তবতা যে, (সত্যকে তাদের কাছে পুরোপুরিভাবে স্পষ্ট করার জন্য) আমার রাসুলগণ তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এত কিছুর পরও তাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করেই চলেছে।

(তাদের জানা উচিত যে), যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং এভাবে পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম করার চেষ্টা চালাবে তাদের শাস্তি এছাড়া আর কিছু্ই নয় যে, তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলকভাবে হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশান্তরিত করা হবে। দুনিয়ায় এটি তাদের জন্য অপমান এবং পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। (সূরা মায়িদা:৩২-৩৩)

এই দুটি অপরাধ ব্যতীত অন্য কোনো অপরাধের জন্য মানুষকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেওয়া যাবে না।

৯.ইসলামে দাসপ্রথা বৈধ নয়, পবিত্র কুরআনে পর্যায়ক্রমে দাস প্রথা ওঠানোর জন্য বিভিন্ন বিধান দেওয়া হয়েছে। তাই ইসলামের নামে কখনোই দাস প্রথা পুনরায় চালু করা যাবেনা।

১০. রাষ্ট্রকে অবশ্যই বিদাত এবং নতুন প্রথার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। ইসলামের প্রতিষ্ঠিত হুকুম বা ইবাদতের মধ্যে নতুন কোনো নিয়ম সংযোজন করাকে বিদাত বলা হয়। এই সংজ্ঞা ঠিক রেখে, প্রতিটি নতুন প্রথা রাষ্ট্র সাদরে গ্রহণ করবে, যদি তার মধ্যে কল্যাণকর কিছু থাকে।

১১. যদি মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে অন্য কোনো রাষ্ট্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয় তবে বেসামরিক নাগরিক এবং যুদ্ধবন্দীদের কখনোই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না। ইসলামের হুকুম হলো যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। এই মুক্তি বিনামূল্যে হতে পারে অথবা মুক্তিপণ গ্রহণের মাধ্যমেও হতে পারে, এছাড়াও যুদ্ধরত রাষ্ট্রের সাথে কোনো চুক্তির মাধ্যমেও যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়া যেতে পারে।

১২. ইসলামের দৃষ্টিতে একটি রাষ্ট্র সর্বদা নিজের করা অঙ্গীকার এবং চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো রাষ্ট্রের সাথে যদি মুসলমানদের রাষ্ট্র চুক্তিবদ্ধ হয় তাহলে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই চুক্তি মেনে চলতে হবে।

কুরআনে বলা হয়েছে,

(হে ঈমানদারগণ, এমতাবস্থায় যদি কোনো মুসলমান সাহায্য ও সমর্থন চায় তবে তাকে মদিনায় আসতে বলো; কারণ), যারা ঈমান গ্রহণ করেছে, হিজরত করেছে এবং নিজেদের প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে আর যারা (হিজরতকারীদের) আশ্রয় দিয়েছে এবং (তাদের) সাহায্য করেছে, তারাই একে অপরের সহযোগী। অপরদিকে যারা ঈমান গ্রহণ করেছে কিন্তু (মদিনায়) হিজরত করেনি, তারা হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের সাথে তোমাদের কোনো সাহায্য-সহযোগিতার সম্পর্ক থাকতে পারে না। তবে তারা যদি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য চায় তাহলে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য; কিন্তু এমন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয় যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে। (স্মরণ রাখো), যা কিছু তোমরা করো আল্লাহ তা দেখেন। (সূরা আনফাল: ৭২)

(ড. ফারহাদ শাফতির প্রবন্ধের আলোকে)

আনুবাদ: ইবনে আনিস ইবনে ইসমাইল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *